বর্তমান কিরগিস্তান এর তালাস নদীর তীরে ঘটে যাওয়া  যুদ্ধের কথা আমরা খুব কম লোকেই জানি যা অষ্টম শতাব্দী তে সংগঠিত হয়েছিল ৭৫১ সালের জুলাই মাসে। চীনা তং সম্রাজ্য  এবং আব্বাসীয় আরব সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘটে যাওয়া অতি সামান্য পরিচিত পাওয়া এই যুদ্ধ কেবল মধ্য এশিয়া বা চীন নয় বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য এর ফল অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

 

অষ্টম শতাব্দী বা তার পূর্বের সময় টা ছিল এশিয়ার যুদ্ধের সময়, যা ছিল তৎকালীন বাণিজ্যিক অধিকার, রাজনৈতিক ক্ষমতা, ও আঞ্চলিক ক্ষমতার এবং ধর্মীয় সহিংসার জন্য যুদ্ধ। এই যুদ্ধের যুগে জোট, প্রতিদ্বন্দ্বিতা , ও বিস্বাসঘাতকতা উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো যুদ্ধ। তালাস নদীর তীরের যুদ্ধের মাধ্যমে মধ্য এশিয়াতে আরব ও চীনাদের অগ্রগতি থেমে যায় যার ফলে মুসলিম ও বুদ্ধিস্ট/ কনফুসিয়ানিস্ট  দের মধ্যে একটি সীমানা তৈরী হয়। যা পরবর্তী সময় এ লক্ষণীয় ছিল।   

 

তং সম্রাজ্য ও তার পূর্বসূরিরা ষষ্ট শতাব্দীর থেকে কিছু সময়ের জন্য মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তারা কৌশল গত দিক থেকে সামরিক অভিযানের বদলে বাণিজ্যিক চুক্তি ও নামমাত্র সুরক্ষার উপর ভিত্তি করে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলো। তং সম্রাজ্যের অস্বস্তিভাব ছিল তিব্বতিদের নিয়ে কারণ চীনের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে  তিব্বতি, তুর্কিক উইঘুর ও অন্যান্য উপজাতিদের সাথে বিরোধ ছিল।

 

আরবদের স্বর্ণ যুগ শুরু হয় নবী মুহাম্মদ সা : এর ইন্তেকালের পর উমাইয়া রাজবংশের অধীনে আরবদের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্য সহ  উত্তর আফ্রিকা  ও পশ্চিমা বিশ্বে স্পেন পর্তুগাল, পূর্বে ও   বিস্ময়জনক ভাবে বাড়তে থাকে। যা চীনাদের জন্য ছিল অস্বস্তিকর , তারা আঞ্চলিক ক্ষমতা, বাণিজ্যিক অধিকার হ্রাসের আশংকায় ছিল। চীনাদের সাথে পার্সিয়ান সম্রাজ্যের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক ছিল বাণিজ্যিক স্বার্থের উপর ভিত্তি করে , যা পরবর্তীতে ক্রমবর্ধমান তুর্কি শক্তিকে উৎখাত করতে পারসিয়ান ও চীন রা তুর্কি বিভিন্ন উপজাতির নেতাদের একে ওপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।ষষ্ট শতাব্দীর পর থেকে সপ্তম শতাব্দীর শুরু থেকে তিব্বতি ও আরব রা চীনের অনেকাংশে নিজেদের কর্তৃত্ব আরোপ করার জন্য অবরোধ করেছিল যা চীনারা কার্লুক সেনাবাহিনীর সহায়তায় তা প্রতিহত করেছিল।আর আরবদের প্রভাব বিস্তারের প্রভাবে চীনারা  মধ্য এশিয়ায় কর্তৃত্ব হারানোর ভয়ে জোটের দিকে ধাবিত হয়। 

 

সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগে যখন উম্মাইয়া রাজবংশ আব্বাসীয় খিলাফত দ্বারা গৃহীত হয় তখন তারা ( আরবরা ) আরো শক্তিশালী হয়ে পড়ে। আব্বাসীয় খিলাফত উমাইয়াদের দ্বারা গঠিত বিশাল বাহিনী সুসংগঠিত হয়। পরে তিব্বতি ও উইঘুর সহযোগীদের নিয়ে গঠিত বিশাল আরব বাহিনীর পূর্ব মধ্য এশিয়ার  নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল জিয়াদ ইবনে সালিহ এবং পশ্চিম চীনা অংশের নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল কও সিয়েন চিহ। আঞ্চলিক কিছু দ্বন্দ্বের প্রভাব এবং আব্বাসীয় ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষে আরব রা জেনারেল কও কে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার লক্ষে তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল যার ফলশ্রুতিতে যুদ্ধের আবহ বিরাজমান ছিল। আর তা যুদ্ধে মোড় নেয়াটা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ৭৫১ সালের জুলাই মাসে বর্তমান কিরগিজ সীমান্তের কাছে তালাস নদীর তীরে দুই বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, যা পাঁচ দিন পর্যন্ত চলমান ছিল। চীন তথ্য অনুযায়ী তং সেনাবাহিনীর মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩০০০০ যা আরব রা স্বীকৃতি দেয় ১০০০০০ বলে। আর আরব জোটের সংখ্যা ছিল বেশি।চীনা তথ্য অনুযায়ী যুদ্ধে কার্লুক দের যুদ্ধ করার কথা ছিল তং বাহিনীর সাথে কিন্তু তারা আব্বাসীয় দের সাথেই তং বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। আর এটাকে একটা বিস্বাসঘাতকতার অংশ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু জেনারেল কও নিজেই খুব কম সময় যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত থেকে পরে পালিয়ে যান পরবর্তীতে দুর্নীতির দায়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। হাজার হাজার সৈন্য এর মধ্যে কয়েকশো সৈন্য যুদ্ধ বন্ধি হিসেবে আটক হয়েছিল।  

 

কও এবং তার তং বাহিনীর পরাজয় হওয়া সত্ত্বেও কার্যত এই যুদ্ধের ফলাফল সমান ছিল। কেননা তং বাহিনীর পরাজয়ে মধ্য এশিয়ার উত্তর ও দক্ষিণ সীমান্তে বিদ্রোহের সূচনা হয় এবং আরবদের পূর্ব মুখী অধিগ্রহণ থমকে যায়। আর এই যুদ্ধের মাধ্যমে তং বাহিনীর অবসান হয় উত্তর চীনের একটি উপজাতির মাধ্যমে। 

 

তালাস নদীর যুদ্ধ আরব দের জন্য ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। কেন্দ্রীয় এশিয়ায় চীনের হস্তক্ষেপ দুর্বল হয়ে পরে যার ফলশ্রুতিতে আব্বাসীয় আরবদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। অনেক ইতিহাসবিদের মতে তালাস যুদ্ধ ছিল ইসলাম ধর্মের প্রভাব বিস্তারের মূল উদ্দেশ্য, যদিও মধ্য এশিয়ার মানুষ সে সময়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নি তবে তারা এ বিষয়ে সমমনা ছিল। পরবর্তী ২০০-২৫০ বছরের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিম গোষ্ঠী গুলো ইসলাম ধর্মে ফিরে আসে।তালাস নদীর যুদ্ধের পর আব্বাসীয় বাহিনী  কর্তৃক যুদ্ধের বন্দীদের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যে, বেশ কয়েকটি দক্ষ চীনা কাগজ শিল্পের কারিগর ছিল, যাদের মধ্যে ছিল তু হুয়ান, তাদের মাধ্যমে প্রথমে আরব বিশ্ব এবং তারপর ইউরোপের বাকি অংশের কাগজ তৈরির শিল্প শিখেছি। (সেই সময়ে আরবরা স্পেন ও পর্তুগালকে নিয়ন্ত্রণ করতো, পাশাপাশি উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়ার বিরাট অংশ) শীঘ্রই কাগজের তৈরি কারখানাগুলি সমরকান্দ, বাগদাদ, দামাস্কাস, কায়রো, দিল্লীতে ছড়িয়ে পড়ে, এবং ১১২০ সালে প্রথম ইউরোপীয় কাগজ মিলটি স্পেনের জাটিভিয়া তে  (বর্তমানে ভ্যালেন্সিয়া নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আরব-আধিপত্যপূর্ণ শহরগুলি থেকে, প্রযুক্তিটি ইতালি, জার্মানি এবং ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

 

 

তালাস নদীর যুদ্ধ শুধু এশিয়ার রাজনৈতিক , ভৌগোলিক ভাবে গুরুত্ব পূর্ণ ছিল না বরং তা সমগ্র বিশ্বের জন্য অনেক গুরুত্তপূর্ণ ছিল। যেখানে চীন দের আঞ্চলিক ক্ষমতা অধিগ্রহণ এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক কৌশল অবলম্বন করা ছিল অন্যতম হাতিয়ার। আর আরব দের অধিপত্য বিস্তার ছিল মূল উদ্দেশ্য।যেখানে একটা সময় সমগ্র মধ্য এশিয়া ইউরোপ জুড়ে আরব দের প্রভাব এবং তাদের কর্তৃক বিভিন্ন অবদান যা কিনা সমগ্র ইউরোপ জুড়েও চর্চা করা হতো আজ তার প্রভাব বা তার বাস্তবায়ন করতে আরব রা কতখানি পিছিয়ে তা আজকের আরব বিশ্ব এবং চীনাদের দিকে দেখলেই বোঝা যায়। যেখানে চীনের অর্থনীতি আর সমগ্র আরব বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় ঈর্ষণীয় এবং আকাশ পাতাল ব্যাবধান। যেখানে চীনের প্রযুক্তি নির্ভর বাণিজ্য কৌশল আর অর্থনৈতিক ভাবে সম্মৃদ্ধশালী আর অন্য দিকে আরব বিশ্বের তেল নির্ভর অর্থনীতি , যেখানে শুধু ব্যাতিক্রম ইরান আর তুরস্ক। ইরান, তুরস্ক বিজ্ঞান চর্চা আর প্রযুক্তি গত দিক থেকে আরব বিশ্বে অনেক এগিয়ে। এক সময় পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট অংশে প্রভাব খাটানো জাতি যার তেল বাণিজ্য বাদ দিলে চীনের কাছে অতি নগন্য। আর চীনা রা তাদের কর্মদক্ষতা আর বাণিজ্য নির্ভর সকল কৌশল অবলম্বন করে আজকে তারা সারা বিশ্বে জায়ান্ট নেশন।আর আরব রা গোড়ামি আর অতি বিলাসী জীবন যাপনে হারাতে বসেছে পৃথিবীর বিভিন্ন বিপ্লবের অবদানের সাক্ষীর শেষ দণ্ড টুকু যেখানে বিভিন্ন মুসলিম মনীষী দের অবদান আজ ফিকে পড়ে গেছে, তাদের নিজেদের গোড়ামি আর অনীহা আজ সমগ্র আরব বিশ্বে অনিশ্চয়তার পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে , যার জন্য দায়ী আরব রা নিজেরাই , যেখানে নিজেদের জন্য নিজেরা আজ সমগ্র মধ্যপ্রাচে  অস্থিতিশীল পরিস্থিতি জন্য দায়ী ! 

 

তালাস নদীর যুদ্ধে হয়তো জয়ী হয়েছিল আরবরা কিন্তু প্রকৃত অর্থে জয়ী হয়েছিল চীনারা। যেখানে চীন দের মাধ্যমে বিশ্ব পেয়েছিলো কাগজ শিল্পের সূচনা। আর পর্যায়ক্রমে আধুনিক কালে চীনারা তাদের কর্মদক্ষতা আর কৌশলগত বাণিজ্যে তাদের নিজেদের নিয়ে গেছে এক অন্য উচ্চতায় আর বিশ্ব কে দিয়েছে তার ফল। আর অন্য দিকে আধুনিক যুগে  আরব বিশ্বের কি অবদান বা এর প্রভাব কতখানি তা সারা বিশ্বের সকলেই জানে। যেখানে একটি জাতি এক সময় সব দিকে নিজেরা স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল আজ তারা কতখানি পিছিয়ে বা তারা নিজেরা নিজেদের আজ কতখানি অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে  তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এর কারণ বা প্রতিকার আমরা জানি তবে তার বাস্তবায়ন কতখানি কষ্টসাধ্য তা বলা আজ অরণ্যে রোদন মাত্র।

- মাহের 
১৮ ই জানুয়ারী ২০১৮

 

Source - Defence Research Forum-DefRes+