আল জাহীয থেকে চার্লস ডারউইন !!! মুসলিম মনীষী ও বিবর্তন তত্ত্বের প্রথম প্রবর্তক !!! ভুলে যাওয়া বিবর্তনবাদের কৃতিত্ব !!!

 

২০১৯ সালে আমরা চার্লস ডারউইনের ২১০ তম জন্মবার্ষিকী পালন করবো আর তার অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ প্রকাশের ১৬০ তম ! যা ছিল জীব বিজ্ঞানের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ ! জীববিজ্ঞান এর জন্য যা বিপ্লব ঘটেছিলো। কিন্তু চার্লস ডারউইনের এই বিবর্তনবাদ তত্ত্বের একক সফলতায়, চিড় ধরানো এক ইতিহাস যা আমরা অনেকেই ভুলে গেছি। ডারউইনের এই তত্ত্ব প্রকাশের প্রায় ১০০০ বছর পূর্বে আব্বাসীয় খেলাফতের সময়কালে ইরাকের বাগদাদের একজন হতদরিদ্র মৎস বিক্রেতা আরব বিজ্ঞানী ও লেখক এই তত্ত্বের গবেষণা করে গেছেন ! যিনি ছিলেন " আবু উসমান ওমর ইবনে বহর আল কিনানি আল বসরী " আল জাহীয নামে অধিক পরিচিত।তিনি ৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে এর ফেব্রুয়ারী মাসে জন্মগ্রহণ করেন আর মৃত্যু বরণ করেন ৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে । তিনি একাধারে ছিলেন একজন দার্শনিক , কবি , প্রাণিবিদ্যাবিদ , গদ্য লেখক , এবং মুসলিম বিশ্বের কয়েকজন বিজ্ঞানীর মধ্যে অন্যতম।তিনি তার প্রখর বুদ্ধি এবং সামাজিক ও প্রকৃতির সমন্বয়ে তার অদ্ভুত লেখনী আর উপস্থিত বুদ্ধি তার লেখনী গুলোতে ছিল এক অনন্য মাধুর্যে ভরা। আল জাহীয তার ৭ ভলিউম এর " কিতাবুল আল হায়ওয়ান " দি বুক অফ এনিমালস " এ তিনি প্রাণীদের মধ্যে যোগাযোগ , অনুকরণ পদ্ধতি , জীবন যাপন এবং কীটপতঙ্গ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বুদ্ধিমত্ত ও তাদের বেঁচে থাকার লড়াই নিয়ে আলোচনা করেছেন।

 

চার্লস ডারউইন । ছবি - সংগৃহীতচার্লস ডারউইন । ছবি - সংগৃহীত

 

আধুনিক যুগে হয়তো অনেক প্রাণীর বুদ্ধিমত্তার ব্যাপার ই আমরা জানি উধাহারণস্বরূপ বোমাবিস্ফোরক গোবরে পোকা। যাইহোক অন্য কোনো স্বতন্ত্র প্রসঙ্গে তা আলোচনা করা যাবে।

 

সপ্তম শতাব্দীতে পূর্ব আফ্রিকান বংশোদ্ভুত একজন দরিদ্র আরব মনীষী যে ছিল প্রথম বিবর্তন তত্ত্বের সূচনাকারি যিনি প্রথম ভাবতে শুরু করেন যে , বিভিন্ন প্রজাতি প্রাণীদের মধ্যে পরিবেশের বিভিন্ন তারতম্য এর ফলে তাদের প্রজাতির উপর প্রভাব পরে। " দি বুক অফ এনিমালস" এ তিনি উল্লেখ করেছেন যে প্রাণীরা তাদের নিজেদের কে সংগ্রামে জড়িয়ে ফেলে, যার ফলে তাদের অস্তিত্ব , তাদের অধিকার , অন্যের হাতে মৃত্যুর আশংকা এবং বংশবিস্তারের জন্য । পরিবেশগত প্রভাব গুলো জীবকে বেঁচে থাকা ও বংশ বিস্তার করার জন্য নতুন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন প্রজাতি তৈরিতে প্রভাবিত করে ! যা তাদের বংশবিস্তারের মাধ্যমে নতুন প্রজাতির বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন প্রজাতি তাদের বংশবিস্তারের মধ্যে অতিক্রম করে। নিঃসন্দেহে আল জাহীয এর তত্ত্ব ' প্রকৃতি ও পরিবেশের তারতম্যের এর প্রভাবে প্রাণী জগতের যে আমূল পরিবর্তন ঘটে তা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না"। আল জাহীয প্রাণীদের খাদ্য শৃঙ্খলে রূপান্তরিত এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন, পরিবেশগত নির্ণায়কবাদ এবং সম্ভাব্য অর্জিত বৈশিষ্ট্যগুলির উত্তরাধিকারী প্রাণীদের একটি পরিকল্পনার প্রস্তাবও করেন। যা আধুনিক কালে তা বিবর্তনবাদ আরো একবার প্রমাণিত করেছে। কিন্তু ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে এই বিবর্তন তত্ত্ব কোনো মর্যাদা পায়নি। যা আজ অবধি মুসলিম বিশ্বে গৃহীত হয় না। আল জাহীয এর তত্ত্বের মনস্তাত্ত্বিক খানিকটা ফারাক ছিল শুধু মাত্র এ সব কিছু ঘটে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছানুযায়ী !

 

তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে প্রাণী উদ্ভিদ থেকেই উদ্ভুত হয়। তিনি ব্যাপকভাবে অস্তিত্ব, অভিযোজন এবং প্রাণী মনোবিজ্ঞানের সংগ্রামের ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন, যা প্রাকৃতিক ভাবে ডারউইনের তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্য । আল জাহীয এর তত্ত্ব ছিল বিশ্বের বিজ্ঞানের ইতিহাসে সর্বপ্রথম বিবর্তনবাদ তত্ত্ব ! যাঁকে বিশ্বের প্রথম বিবর্তনবাদ বলা যেতে পারে। তিনি সর্বপ্রথম পরিবেশগত পরিবর্তন এর কারণে প্রাণিজগতের প্রজাতির বৈশিষ্ট্য গত বা ক্রমান্বয়ে জিনগত যে পরিবর্তন হয় তা সর্বপ্রথম আল জাহীয ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

 

আল জাহীয । ছবি - সংগৃহীতআল জাহীয । ছবি - সংগৃহীত

 

তারপরে, বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া এবং প্রজাতির রূপান্তর সম্পর্কে তাঁর বিপ্লবী ধারণাগুলি অনেক মুসলিম পন্ডিত ও বিজ্ঞানী তা নিয়ে চর্চা করেছেন। মধ্যযুগীয় ইসলামী স্কুলে এই ধারণার বিবর্তন ব্যাপকভাবে শেখানো হয়। তদনুসারে, প্রাক-ডারউইনের মুসলিম পণ্ডিতেরা ইতিমধ্যে বিবর্তনের ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং ডারউইনকে তার তত্ত্বের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে উপকরণ সরবরাহ করেছেন যা এই বৈজ্ঞানিক ভাষা দিয়েছিল। কিন্তু কীভাবে আল জাহীযের ধারণা ইউরোপীয়দের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে? ডারউইন কি এই লেখাগুলি সম্পর্কে জানেন? চার্লস ডারউইন অনুপ্রেরণা বলতে সবাই উল্লেখ করে যে তার অস্ট্রেলিয়া , কেপ টাউন, দক্ষিণ আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বন্য প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে। কিন্তু সব থেকে গুরুত্ব পূর্ণ একটি অংশ সবাই উল্লেখ করেন না যে , ডারউইন মুসলিম সাহিত্যের মধ্য থেকে প্রাণী বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

 

 

বস্তুত, জার্মানিতে প্রাকৃতিক দর্শনের স্কুল উত্থাপন করার আগে, আল জাহীয এবং অন্যান্য মুলিম মনীষীদের গবেষণা বা লেখনী ইউরোপীয় ভাষায় তাদের কাজের অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপীয়দের কাছে সুপরিচিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, আল-দামরির "হায়াত আল-হায়াওয়ান" একজন ইহুদি দ্বারা ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়, যার নাম আব্রাহাম ইখইলেনসিস এবং ১৬১৭ সালে প্যারিসে প্রকাশিত হয়।আল দামারির গ্রন্থটি আল জাহীযের গ্রন্থ থেকে গৃহীত অনেক অনুচ্ছেদ এবং তার বিবর্তন তত্ত্ব । অনেক অন্যান্য কাজের পাশাপাশি, ইবনে তুফালের "হায়ি ইবনে ইয়াকজান", যা বিবর্তনের দর্শনের অন্তর্ভুক্ত, প্রথমটি ১৬৭১ সালে অক্সফোর্ডে ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। অনুবাদ কার্যক্রমের কারণে, প্রাণিবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের ইসলামী জ্ঞান ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সতেরো শতকের শুরুতে প্রবেশ করেছিল এবং প্রাণিবিজ্ঞান এবং জীববিদ্যা আধুনিক রূপ প্রাপ্তির সিঁড়িতে যুক্ত হয়েছিল। ডারউইন তাঁর পিতামহ ইরাসমাস ডারউইন থেকে বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন , যিনি শত শত বছর আগে মুসলিম দার্শনিকদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ ধারণা পেয়েছিলেন। তারপর ডারউইন এই ধারণার সমর্থনে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। পাশাপাশি, চার্লস ডারউইন নিজেকে আরবি বুঝেছিলেন এবং আরবি সাহিত্যে সরাসরি প্রবেশ করেছিলেন। তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় অনুষঙ্গে ইসলামী সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেন এবং ইসলামকে বোঝার জন্য তিনি আরবী শিখেছিলেন। তাই এটি নিশ্চিত যে চার্লস ডারউইন মুসলিম পন্ডিত ও দার্শনিকদের কাজ এবং ধারণাগুলির সাথে আল জাহীয সহ অন্যান্য মুসলিম মনীষীদের দর্শন ও জ্ঞানের সাথে পরিচিত ছিলেন এবং মুসলিম মনীষীদের দর্শন থেকে প্রাপ্ত ধারণা ব্যবহার করে বিবর্তন তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছেন !

 

Al-Jahiz - pages from Kitaab al HayawaanAl-Jahiz - pages from Kitaab al Hayawaan

 

যদিও মুসলিম বিশ্বের প্রায়ই বৈজ্ঞানিক এর মধ্যে আবিষ্কারের জন্য অনীহা দেখা যায়, তবে আমরা পূর্বের আরব বিশ্বের দিকে ফিরে তাকালে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির স্বর্ণযুগ বিশ্বের প্রথম পদার্থবিজ্ঞানী এবং বিশ্বের প্রথম রসায়নবিদ,সার্জারি এবং শারীরস্থান অগ্রগতি, চিকিৎসা , সাহিত্য , জ্যোতির্বিদ্যা , ভূতত্ত্ব এবং নৃতত্ত্বের জন্ম, প্রকৌশল এর অসাধারণ বর্ণনা দেখতে পাই।

 

৭০০ বছর ধরে, বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক ভাষা ছিল আরবি; এবং বাগদাদ, শক্তিশালী আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী, বুদ্ধিজীবী বিশ্বের কেন্দ্র ছিল। রহস্যজনক হলেও সত্য যে ইউরোপিয়ান রা মুসলিম মনীষীদের এই সব অবদান সব সময় কৌশলে এড়িয়ে যায়। আব্বাসীয় দের বা আরব দের কে শুধু মাত্র ইউরোপিয়ান বিজ্ঞানের অভিভাবক হিসেবে ধরা হয়। তাদের কোনো কৃতিত্ব প্রদান করা হয়না।

 

ইতিহাস ভুলতে বসেছে এই সকল মুসলিম মনীষীদের কথা। যাদের প্রভাবে আজ আধুনিক বিজ্ঞান রচিত হয়েছে তারা আজ বিশ্বে রক্ষণশীলতার ট্যাগ নিয়ে বিশ্ব দরবারে পিছিয়ে আছে। ধর্মীয় উত্তেজনা বৃদ্ধির এক জগতে, আরবি বিজ্ঞানের অস্পষ্ট ঘটনাটি পশ্চিমা বিশ্ব সর্বদা ঔদাসীন্য থেকেছে। যেখানে মুসলিম বিশ্ব গর্ব করতে পারে তাদের অবদান নিয়ে। কিন্তু তা আজ অবহেলিত , এবং সত্য ইতিহাস আর তার থেকে প্রাপ্ত দর্শন এগিয়ে যাওয়ার পাথেয় হতো। কিন্তু আরব বিশ্বের অতি উদাসীনতা আর বিজ্ঞান চর্চায় অবহেলা , আর অতি বিলাসপ্রি় জীবন যাপন , অলসতা , গোড়ামি আর অতি মাত্রার রক্ষণশীলতা এর প্রভাবে হারাতে বসেছে তাদের পূর্বপুরুষের অবদান আর তাদের ঐতিহ্য , আর পৃথিবী বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃত ইতিহাস থেকে। আর হয়তো পরোক্ষ ভাবে বিজ্ঞানের কুফলতা প্রয়োগ হচ্ছে তাদের উপর। যেখানে সব অন্তরায় উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়া মনীষীরা আজ পরাজিত হয়েছেন তাদেরই বংশধরদের কাছে। যেখানে তাদেরই দর্শন তত্ত্ব ব্যবহার করে তাদেরকেই বলির পাঠা বানানো হচ্ছে। আর ইতিহাস হারাচ্ছে তার গৌরব। তবে আল জাহীয বেঁচে থাকবেন চিরকাল তার কর্মে , দর্শনে , হোক বা সে ডারউইনের তত্ত্বের মাঝে হোক বা সে ইতিহাসে ! আল জাহীয বেঁচে থাকবেন প্রতিটি মানব জাতির কল্যাণে !

 

মাহের

আসছে পর্ব - ২