নার্সিং সেবা একটি মমতার পেশা ! যা শুনলে সবার মনের কোণে উঁকি দেয় একটি নাম ফ্লোরেন্সে নাইটিঙ্গেল ! যিনি বিশ্ব জোড়া পরিচিত " দি লেডি উইথ দি ল্যাম্প " ক্রিমিয়ান যুদ্ধের সময় যুদ্ধাহত সৈন্য দের সেবা প্রদান করেছিলেন এই মমতাময়ী নারী ! যা তাকে বিশ্বের ইতিহাসে এক সম্মান ও ভালোবাসার চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে ! তিনি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করে যুদ্ধাহত সৈন্য দের সেবা করে তাদের সারিয়ে তুলতেন ! গভীর রাতে তিনি লণ্ঠন হাতে আহত সেনাদের খোঁজ খবর নিতেন ! তার পরম মমতার জন্য তাকে মানবতার প্রতীক ভাবা হয় ! পশ্চিমা বিশ্বের সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নেন যে আধুনিক নার্সিং সেবার জনক ফ্লোরেন্সে নাইটিঙ্গেল !! যার হাতে সূচনা হয়েছিলো আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রযাত্রা !

 

কিন্তু ফ্লোরেন্সে নাইটিঙ্গেল এর ঠিক ১২০০ বছর আগে নার্সিং সেবার মূল তত্ত্ব এবং আধুনিক নার্সিং সেবার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে গেছেন আরবের একজন মহিয়সী নারী !!! যার কথা ইতিহাস ভুলতে বসেছে !! ভুলতে বসেছে তার অবদানের কথা ! সৌদি আরবের মদিনার ইয়াত্রিবের খাজরাজ আদিবাসীদের বনি আসলাম গোত্রে আনুমানিক ৬২০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন !! তার নাম হলো রুফায়দা বিনতে সাদ এবং তিনি রুফায়দা আল আসলামিয়া নাম পরিচিত কারণ তিনি বনি আসলাম গোত্রের হওয়ার কারণে এই নাম পরিচিত ছিলেন ! ! তিনি ছিলেন একাধারে একজন চিকিৎসক, সমাজ সংগঠক , সমাজকর্মী, এবং পরোক্ষ ভাবে সমাজে নারীর ভূমিকার বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন !!

 

রুফায়দা আল আসলামিয়া এবং তার পরিবার তৎকালীন চিকিৎসা সেবার জন্য বিখ্যাত ছিল। রুফায়দার বাবা সাদ আল আসলামী ছিলেন একজন চিকিৎসক। রুফায়দা বাল্যকাল থেকেই চিকিৎসা সেবার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ এবং তাঁর বাবার দিক নির্দেশনায় তিনি বাল্যকাল থেকেই চিকিৎসা সম্পর্কে অনেক জ্ঞান লাভ করেন। তিনি তার বাবার থেকে প্রাপ্ত চিকিৎসা বিষয়ক জ্ঞান মানব কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার এক সংকল্প করে ফেলেছিলেন ! তিনি ছিলেন অত্যান্ত বুদ্ধিমতী , পরম দয়ালু , মিষ্ট ভাষী , এবং পরম মমতায় ভরা একজন নারী। তিনি হজরত মুহাম্মদ (সা :) এর মদিনায় হিজরতের সময় প্রথম নারী ছিলেন যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি নবী মোহাম্মদ (সা :) কে স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং প্রথমে আনসার নারীদের সাথে তার অবদানের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি তার পরিবার থেকে প্রাপ্ত চিকিৎসা জ্ঞান এবং তার মমতার স্পর্শ তৎকালীন সময়ে তাকে একজন বিখ্যাত নিরাময়কারী হিসেবে পরিচিতি এনে দেয় !

 

হজরত মুহাম্মদ (সা :)  এর সময় বেশ অনেক গুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয়। তার মধ্যে ছিল খাইবার এর যুদ্ধ খাইবার যুদ্ধের সময় রুফায়দা আল আসলামিয়া সাথে কিছু স্বেচ্ছা সেবী নারী কে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কে চিকিৎসা সেবার উপযুক্ত করে তুলেন।যাদের মধ্যে ছিলেন উম্মে আতিয়াহ, উম্মে সুলাইম, হামনা বিনতে জেহাদ, লায়লা আল-গিফারিয়াহ (আবু থারের স্ত্রী), উম্ম আয়মান এবং রুবাইয়ী বিনত মুয়াউদ।তিনি এবং তার দল নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। যুদ্ধাহত সকল সৈন্য দের সেবা প্রদান করে তাদের সরিয়ে তুলতেন ! তাদের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ মোহাম্মদ সা : তাদের কে যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত সামগ্রী সৈন্য দের সমান ভাগ করে দিতেন ! তাকে এবং তার সঙ্গীদের যোদ্ধার মর্যাদা দেয়া হয়েছিল।প্রাপ্ত ইতিহাস থেকে জানা যাই যে আল খন্দক যুদ্ধের সময় সাদ আল মুয়াজ রা : যখন যুদ্ধে আহত হয় তখন মোহাম্মদ সা : সাহাবী দের কে নির্দেশ দেন যে সাদ আল মুয়াজ রা : কে রুফায়দা এর তাবু তে নিয়ে যেতে। যেন তিনি তার সেরে ওঠা নিশ্চিত করেন !

 

 

তিনি ছিলেন একমাত্র মহিলা যাঁকে মুহাম্মাদ সা : মদিনাতে মসজিদ (আল-মসজিদ-নাবাওয়ী) এর ভিতরে তাঁবু স্থাপন করার অনুমতি প্রদান করেন এবং নার্সদের তত্ত্বাবধানে আরও মুসলিম নারী ও মেয়েকে প্রশিক্ষণ প্রদানের অনুমতি দেন। রুফায়দা আল আসলামিয়া বদর, উহুদ, খন্দকার, খাইবার এবং অন্যান্যদের যুদ্ধে অংশ নেন।তিনি মুসলমানদের সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে মানবিক প্রচেষ্টার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

 

রুফায়দা শুধু নিজেকে এই নার্সিং সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন নি ! তিনি তার মতো অনেক নারীকে মানব সেবায় উদ্বুদ্ধ করে তাদের কে প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি দল গঠন করেন যা সব সময় আহত সেনাবাহিনী কে সেবা প্রদান করতো।রফায়দা আল আসলামিয়া চিকিৎসার প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম প্রথম নথিভুক্ত মোবাইল ইউনিট গঠন করেন তার ক্লিনিকাল দক্ষতা এবং চিকিৎসা অভিজ্ঞতা বাস্তবায়িত করার লক্ষে ! তার সংগঠিত মেডিকেল কমান্ড ইউনিটের প্রধান উদেশ্য ছিল বেশিরভাগই প্রধানত স্বাস্থ্যবিধি এবং রোগীদের স্থির করে তুলতে সক্ষম চিকিৎসা পদ্ধতি এবং তিনি সার্জারি এবং এর প্রতিষেধক ব্যাবস্থার উপর জোর দিতেন।তিনি সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে মানব সেবার জন্য নারীর ভূমিকার বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন ! তিনি শুধুমাত্র চিকিৎসা বা নার্সিং সেবা নয় , তিনি সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের সংগঠক এর ভূমিকা পালন করতেন। তিনি ধৈর্য্যশীল, প্রবক্তা, অনুগত এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হিসেবে, এবং একটি ভাল সংগঠক, সমাজ কর্মী।তিনি ছিলেন ধৈর্য্যশীল, প্রবক্তা, অনুগত এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সমাজসেবী এবং একটি ভাল সংগঠক হিসাবে পরিচিত ছিলেন ।

 

তিনি অনাথ, অক্ষম , সুবিধাবঞ্চিত এবং অসুস্থ মানুষ কে সেবা প্রদান করতেন। শিশু এবং তাদের মানবিক বিকাশের জন্য কাজ করতেন। স্থানীয় ভাবে তিনি নারীদের একটি দল গঠন করেছিলেন যেখানে সামাজিক উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডে তারা ভূমিকা রাখতো। তিনি যুদ্ধ পূর্ব এবং যুদ্ধ পরবর্তী সকল দিক নির্দেশনার মধ্যে একটি নীতিমালা মেনে চলতেন। যেখানে সৈন্য দের তাঁবু খাটানো তাদের বাসস্থান , তাদের সকল ধরণের প্রাথমিক সেবা প্রদান ছিল মূল উদ্দেশ্য। রুফায়দা আল আসলামিয়া তৎকালীন পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থার মধ্যে একজন নারী হিসেবে একটি ইউনিট এর নেতৃত্ব প্রমান করে তার মহানুভবতা আর তার দক্ষতাকে। আর তিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন ভালো সংগঠক। তার নেতৃত্বে তিনি গড়েছিলেন একটি নার্সিং ইউনিট ! তিনি প্রিভেন্টিভ কেয়ার এর জন্য সুপারিশ করেছেন এবং এমনকি তার মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম কোড অফ নার্সিং আচরণ এবং নীতিমালা খসড়া করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। যা তাকে বিশ্বের প্রথম আধুনিক নার্সিং সেবার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনকারী মনে করা হয় !! আজ ইতিহাস ভুলতে বসেছে বর্তমান প্রজন্ম । আর এক পরম মমতাময়ীর নাম। যাকে তার কর্মের দ্বারা কেও মনে রাখেনি। তিনি আধুনিক নার্সিং সেবার ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন।এতদিন এই মহৎ মহিয়সী নারীকে তার কৃতিত্বের কথা স্মরণ করা হতো মৌখিক ভাবে।

 

সম্প্রতি কিছু দশকে তাকে নিয়ে আবার আলোচনা চলছে। নার্সিং সেবায় তার ভুলে যাওয়া অবদান এবং প্রকৃত ইতিহাস আজ অজানা। তবে তার অবদানের পুরুষ্কার স্বরূপ পাকিস্তানে আগা খান ইউনিভার্সিটি স্কুল অব নার্সিং এর একটি বিল্ডিংয়ের নামকরণ করা হয় তার নামে এবং প্রতি বছর বাহরাইন বিশ্যবিদ্যালয় রুফায়দা আল আসলামিয়া পুরষ্কার প্রদান করে। যখন ইউরোপ ও আমেরিকার নার্সিং ইনস্টিটিউট যখন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলকে আধুনিক নার্সিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তখন ১৪০০ বছর আগে আধুনিক নার্সিং সেবার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী মমতাময়ী রুফায়দা আল আসলামিয়া পর্দার আড়ালে চলে যান। ঢাকা পরে যায় তার বীরোচিত কৃতিত্ব গুলো।পৃথিবী বঞ্চিত হয় এক অজানা ইতিহাস থেকে। তবুও রুফায়দা থেকে যাবেন, চিরকাল অমর থাকবেন তার বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য , তার মমতার জন্য। রুফায়দা আল আসলামিয়া কে সম্মান জানানো জন্য এবং তার অবদান গুলোর স্বীকৃতি এবং এই মহৎ পেশা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফ্লোরেন্সে নাইটিঙ্গেল ও রুফায়দার জন্য শ্রদ্ধা নিবেদন করে " জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি সম্পর্কে কোন পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই আমরা সমস্ত দক্ষতা এবং বুদ্ধিবৃত্তির সাথে অসুস্থতার যত্ন নিবো । এবং সামাজিক অবস্থা, জীবন বাঁচানোর জন্য যেকোনো কোন প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, যা হবে দুঃখকষ্ট উপশম করা এবং স্বাস্থ্য উন্নীত করা।

 

 আরব বিশ্বের প্রথম এই মুসলিম মহীয়সীকে পৃথিবী মনে রাখবে তার কৃতিত্বের জন্য। যিনি ছিলেন আছেন থাকবেন আজ বিশ্বের প্রতিটি নার্সের সেবার মাঝে। তিনি থাকবেন সবার প্রেরণা হয়ে।রুফায়দা আল আসলামিয়া আধুনিক নার্সিং সেবার পথিকৃৎ হয়ে ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অমর থাকবেন। তৃতীয় পর্ব আসছে।

 

মুসলিম মনিষীদের না বলা গল্প এবং অজানা ইতিহাস পর্ব - ১

 

অমিত বিক্রমশালী বাংলার যোদ্ধা হাতি : আমাদের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস।

আরবদের সাথে চীনের ট্যাং ডাইনাস্টির যুদ্ধ। এক অজানা ইতিহাস