ঐতিহাসিক আর সি মজুমদার বারো ভুঁইয়ার এক ভুঁইয়া খাজা ওসমানের প্রধান দুটি হাতির নাম উল্লেখ্যে করেছেন বাজ ও বখত। মির্জা নাথান খাজা ওসমানের আরো কয়টি যোদ্ধা হাতির নাম উল্লেখ্য করেছেন তার “বাহারিস্তান ই গায়বী” তে অনুপা, সিঙ্গালী, দাস্তা, শতরঞ্জী। মোঘল হাতিগুলোর মধ্যে নামকরা ছিল বাঘদলন, বালসুন্দর, চঞ্চল, ফাতহা, গোপাল ও রনসিঙ্গার। সিলেটের ভুঁইয়া বায়জিদের প্রধান হাতির নাম ছিল “আবর”। এইসব যোদ্ধা হাতি যুদ্ধের ময়দানে ইস্পাত নির্মিত বর্মের মত আচ্ছাদান ব্যাবহার করত যাকে বলা হত “পাখার”।  

 

মোঘল সেনাপতি মির্জা নাথান দ্ব্যার্থহীন ভাবে তার হাতি গুলোর তুলনায় যে বারো ভুঁইয়াদের হাতি অনেক উৎকৃষ্ট যোদ্ধা ছিল সেটা স্বীকার করে গেছেন। মাতঙ্গের জমিদার পাহলোয়ান ছিলেন বিখ্যাত যোদ্ধা তিনি তার মোঘল প্রতিপক্ষ শামসুদ্দীন কে পরাজিত ও হত্যা করে নিজেও যুদ্ধে জীবন দেন। মির্জা নাথানের বর্ননা থেকে পাহলোয়ানের বিখ্যাত যূদ্ধা হাতি “বাজে”র সাহসিকতার কথা জানতে পারি। বাজ অতি সহজেই শত্রু দূর্গের গেট ভেঙ্গে ফেলত তার অমিত শক্তি দিয়ে। বাজের পায়ে পায়ে ঘেষে পাহলোয়ানের সেনারা শত্রু দুর্গে ঢুকে হাতাহাতি যুদ্ধে লিপ্ত হত। মোঘল সেনারা বাজের চারটি পাই কেটে টুকরো টুকরো ফেলে কিন্তু মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও বাজ আমৃত্যু যুদ্ধ করে গেছে।  নাথান মির্জা ওসমানের প্রধান হাতি “বাখতা”রের বীরত্বের বর্ননা দিয়েছেন তার লেখায়। বাখতা ছিল আকারে পাহাড়ের মত। দুর্গের পাথর ভেঙ্গে ফেলার মত শক্তি বাখতার ছিল। যুদ্ধের মাঠে মাহুতের হুকুম ছাড়া বাখতা কে এক পা ও নড়ানো যেত না এই বিশেষ গুনের জন্য বাখতা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

 

বাদশাহ জাহাঙ্গীর বাখতাকে তার জীবন স্মৃতিতে “গজপতি” উপাধিতে ভুষিত করেছেন। ইকবাল নামায় লেখা আছে খাজা ওসমান বাখতা কে সামনে রেখে মোঘলদের আক্রমন করতেন। আবার কখনো কখনো বাখতা কে লুকিয়ে রেখে অন্য হাতি দিয়ে আক্রমন শানানো হত। যুদ্ধের বিশেষ মুহুর্তে সেই লুকানো বন জঙ্গল ভেদ করে চলমান দুর্গের মত যখন বাখতা যুদ্ধের ময়দানে ধেয়ে আসত শত্রু তখন পলায়নের পথ পেতনা।

 

মির্জা ওসমানের সাথে মির্জা নাথানের দৌলাম্বাপুরের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক যুদ্ধে হাতির যুদ্ধের বেশ ভালো একটা বর্ননা দেয়া আছে  সে যুদ্ধে মোঘল হাতি “গোপাল” বাংলার হাতির পরাক্রমের সামনে টিকতে না পেরে পালিয়ে যায়। মির্জা নাথানের শক্তিশালী হাতি “বাঘদলন” কে ওসমানের আর একটি হাতি “অনুপা” নাজেহাল করে। নাথানের দূরন্ত হাতি “চঞ্চল” ওসমানের অমিত বিক্রমশালী “বাখতা”র দিকে তেড়ে যায় কিন্তু বাখতার এর সওয়ারী গোলন্দাজদের গুলির আঘাতে আহত হয়ে চঞ্চল পালিয়ে যায়। ওদিকে ওসমানের “সিংহলি” দ্বৈরথে নামে মোগল হাতি “বালসুন্দরে”র সাথে। বালসুন্দর অনেক টা পরাজয়ের দ্বার প্রান্তে চলে যায় এই সময় আর একটি মোগল হাতি এগিয়ে যায় বালসুন্দরের সহায়তায় এ অবস্থায় দ্বৈত আক্রমনে সিংহলি পিছু হটে। এই দৌলাম্বপুর যুদ্ধে মির্জা ওসমান নিহত হলে মির্জা ওসমানের ছেলে আর ভাইয়েরা বাখতা কে নিয়ে মির্জা নাথানের মোগলসেনাদের ওপর ঘুর্নিঝড়ের মত ঝাপিয়ে পড়েন। বাখতার আক্রমনে মোঘল বাহিনী খড় কুটোর মত উড়তে থাকে। এক পর্যায়ে যুদ্ধ মদমত্ত বাখতা মির্জা নাথানের নাগাল পেয়ে তার ঘোড়া সহ শুড় দিয়ে তুলে ফেলে দূরে ছূড়ে ফেলে। ভাগ্য ভালো সে যাত্রা মির্জা নাথান আহত হলেও জানে বেচে যান।

 

মোগল সেনারা ঘিরে ফেলে বাখতাকে। ধারালো তলোয়ার দিয়ে বাখতার পা, শুড় আর দাত কেটে ফেলতে থাকে। এ অবস্থাতেও মরনপন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে বাখতা। এক পর্যায়ে প্রভু মির্জা ওসমানের মত বীরের বেসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে যুদ্ধ ক্ষেত্রে। বন্দী হবার থেকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে বীরের মৃত্যুকেই বেছে নেন মির্জা ওসমান আর তার প্রান প্রিয় যুদ্ধ হাতি বাখতা। এক পর্যায়ে মোঘলদের আক্রমনে টিকতে না পেরে মির্জা ওসমানের ভাই ও ছেলেরা আত্মসমর্পন করে।

 

ওসমানের সব যুদ্ধ হাতি জাহাঙ্গীর নগর সুবেদার ইসলাম খানের নিকট পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঢাকায় এক মাঠে এসব যুদ্ধ হাতির প্রদর্শনীর ব্যাবস্থা করা হয়। পরে এগুলো দিল্লী পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঢাকা থেকে দিল্লীর কঠিন পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক হাতিই পথে মারা যায়। ঢাকার মাঠে ওসমানের হাতি “দাস্তা” একজন মোঘল সেনাকে আক্রমন করে। হাতির স্মৃতি শক্তি দীর্ঘ আর প্রতিশোধ স্পৃহা তার থেকেও লম্বা। ধারনা করা হয় যুদ্ধ ক্ষেত্রে ওই সেনা দাস্তার মাহুতকে হত্যা করেছিল। দাস্তা সুযোগ পেয়ে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও প্রতিশোধ নিতে ভুলেনি। আমাদের রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস, তার কতটুকুই আমরা জানি? জানি না আমাদের গর্ব আমাদের ঐতিহ্য আমাদের যোদ্ধা হাতিগুলো সমন্ধে।