ক্ষুদ্র জীবনের কিছু ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি। জীবনের প্রয়োজনেই বালক কৈশোরে প্রবেশের পূর্বে পরিবার ছেড়েছিলাম । অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছিলাম ভালো শিক্ষা দীক্ষা নিবো বলে। সামাজিক বন্ধনের বাইরে থেকে সঙ্গী করেছিলাম একাকীত্ব। পড়াশোনা নামের যন্ত্রণার প্রতি অনাগ্রহের শুরু বোধ করি তখন থেকেই। যাই হোক, ক্রমেই সেই একাকীত্ব আমার মাঝে বুনেছে যুদ্ধ জয়ের শক্ত ভীত। যতই, এগিয়েছি, মুখোমুখি হয়েছি ভিন্নসব অপ্রত্যাশিত বন্ধকের। তবুও এগিয়েছি, গতি কখনো কমেছে হয়তো, কিন্তু থামা হয়নি কখনো।

 

সামাজিক দায়বদ্ধতার বাইরে থাকা থেকেই হয়তো আমার মাঝে অসামাজিকতার শুরু। নিজের গন্ডির বাইরে বিচরণে যেমনটা অনাগ্রহ ছিল, তেমনটা ভীতি ছিল আভিজাত্যের প্রতি। তবে সবকিছু ছাড়িয়েই নিজের একটি রাজ্য ছিলো আমার। সেই রাজ্যের রাজা আমি। নিজের খেয়াল খুশিমতই চলতো আমার রাজ্য। নিজের কল্পনাটুকু রাঙ্গাতে এতটুকু ছাড় দেইনি কখনো। আমার স্বপ্ন আমি বুনি আমার মত করে। চাঁদ ছোয়ার স্বপ্ন সবার, কিন্তু আমি সাজিয়ে নেই আমার আপন পথ। কখনো শুনেছি মন্দবাক্য, কোথাও পেয়েছি অপ্রস্তুত বাধা, কিছুটা ছিল পিছুটান, তবুও আমি জিতেছি। আমার স্বপ্ন খুজে পেয়েছে আপন ঠিকানা।

 নিজের কল্পনাটায় আমি আপোষ করিনা কোনোকিছুর সাথেই। সবসময় প্রস্তুত রাখি উজ্জ্বল বিকল্পটার। হতাশার চাদরটা তুলে রেখেছি অনেক উচুতে। হ্যা, সেই কৈশোর থেকেই স্বপ্ন দেখেছিলাম নেতৃত্ব দেয়ার, নেতৃত্বে গিয়ে নিজেকে মেলে ধরার। তাই, সামরিক বাহিনীতে যাওয়াটাই ভেবেছিলাম সর্বোত্তম পন্থা। কিন্তু এ যাত্রায় স্বপ্ন খুজে পেলনা তার আপন ঠিকানা। তো, কি হয়েছে? আমার রাজ্যের রাজাতো আমিই। রাজা কখনো পিছু হটে না। একটা প্রবাদে সবসময়ই আমার আগ্রহ ছিল “War makes king and Kings make war”. যুদ্ধে হারার পথটা মসৃণ, কিন্তু জেতার কৌশল অনেক। বালক এবার বিকল্পটায় হাত বাড়ালেন ভিন্ন কৌশলে।

 

স্বপ্ন এবার সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়া, নীতি প্রণয়নে নেতৃত্ব দিয়ে দেশসেবার অগ্রসৈনিক হওয়া। তাই, প্রশাসন ক্যাডারটাই ছিল প্রথম পছন্দের। শুরু হয়ে গেল নতুন গন্তব্যে যাত্রা। যাত্রাপথে সমালোচনা থেকে অবজ্ঞা, কটুক্তি থেকে নিরুৎসাহ কোন কিছুরই কমতি ছিলোনা। সমালোচনার উত্তর দেইনি কখনো, মনে বিশ্বাস ছিল আমিই আলোচনার বিষয় তৈরি করবো। অবজ্ঞার ঘুন গায়ে মাখিনি, স্বপ্ন ছিল আমিই তাদের আস্থা হবো। কটুক্তির জবাব দেইনি, ভেবেছি তাদের কবিতায় প্রাণ ফেরাবো। নিরুৎসাহের ডানা ঝাপটে ধরেছি, তাদের জন্য আদর্শের পায়রা উড়াবো বলে। একটু বাড়িয়ে বললাম বোধহয়? মোটেও না। বিশ্বাস করুন, এটাই ছিল আমার আত্মবিশ্বাস। এটাই রচনা করেছে আমার স্বপ্নজয়ের ভীত।

 

সিভিল সার্ভিসের উদ্দেশ্যে যাত্রার আমার দীর্ঘপথটি সাজিয়েছিলাম একান্ত নিজের মত করেই। গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করিনি এতটুকুও। নিজেকে অনেকটা আলাদা করে নিয়েছিলাম সবকিছু থেকেই। টিএসসির আড্ডা বা লাগামহীন তাসের আসর, জগন্নাথ হলের মাঠে ক্রিকেট বা লাগামহীন রাতের ঘুরাফেরা, বন্ধুদের সাথে আনন্দ ভ্রমণ বা মল চত্তরের আড্ডা, সবকিছু তুলে রেখে সারাদিনের ঠিকানা বানালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। বিবিএ টা শেষের পর এমবিএ বিসর্জন দেয়ার মত কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতেও দেরি হলোনা, লক্ষ্যটা অবিচল ছিল বলেই। হাড়কাপানো কনকনে শীতের মাঝেও নিজের অজান্তে ঘুম ভাঙ্গতো ভোর পাঁচটায়, লক্ষ্যটা অবিচল ছিল বলেই। বিকেলের ক্লান্তিভয়ে দুপুরের দারুণ খিদেটা উবে যেত, লক্ষ্যটা অবিচল ছিল বলেই। রাত ১০ টায় বাসায় ফিরে নিজের অজান্তেই আবার বইখানা হাতের মুঠোয় উঠে আসতো, লক্ষ্যটা অবিচল ছিল বলেই। ধকলময় সারাদিন পর রাত ১২ টায়ও ক্লান্তিটা মুখ লুকোতো, লক্ষ্যটা অবিচল ছিল বলেই।  আমার বিশ্বাসটা যতই শক্ত ছিল, ভুবনটা ছিল ততই রঙ্গীন। ভিন্ন প্রতিকূলতায় কখনো কখনো হয়তো রংটা বদলেছে, কিন্তু বিবর্ণ হতে দেইনি। নিজেকে যেমন কারো প্রতিযোগী ভাবিনি কখনো, তেমনি অন্যকে কখনো নিজের প্রতিযোগী ভাবিনি। শুধু নিজের কাজটি নিজে করেছি নিজের মত করেই।

অতঃপর, ডানা মেলল স্বপ্নের প্রথম পাখি। দীর্ঘ যাত্রার পর দেখা মিললো বিসিএস (প্রশাসন) নামের সোনার হরিণটির। সমালোচক থেকে অবজ্ঞাকারী, কটুক্তিকারী থেকে নিন্দুক সবাই ফিরে এল শুভেছার বার্তা নিয়ে। ও হ্যা, আমি মনে রাখিনি কোন অতীত, সবার মাঝেই ব্যক্ত করেছি আপন প্রত্যয়। সবার সাথে মেতেছি আনন্দের রঙ্গে হোলি উৎসবে।

 

যুদ্ধ চলছে আজো। আমৃত্যু চলবে, আর রাজা লড়বে আপন মহিমায়। আমার বিশ্বাস, আমার আদর্শ, আমার পথচলা দ্যুতি ছড়াবে আপন বর্ণে, আমার মাঝে। লড়বো আমৃত্যু, হয়তো যথানিয়মে সরে যেতে হবে একপ্রান্তে, কিন্তু হারবে না আমার স্বপ্ন, সরে দাঁড়াবে না আমার আদর্শ।