বিসিএস এ আপনার চারপাশের ভাই বোনদের সাফল্য দেখে মনে মনে আপনি ভাবছেন সামানের বিসিএস টা আপনার হতেই হবে। আপনি ও একটা শুকরিয়ার স্টাটাস দিবেন । বুক ভরে লম্বা একটা শ্বাস নিবেন।সুখের কান্নাটা আপনার চোখে ও অশ্রু হয়ে ঝড়বে ।

লিখেছেন - ইব্রাহিম খলিল মুহিম, এডমিন ক্যাডার, ৩৬ তম বিসিএস 

 

বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্তদের কাছ থেকে আগামীর বিসিএস ক্যাডারদের অনুপ্রেরণা দিয়ে তেমন কোন লেখা চোখে পড়ল না্ । মে বি এটার একটা বড় কারণ - সবাই এখন সেলিব্রেশন নিয়ে ব্যস্ত , আর মনের মধ্যে সুক্ষ একটা প্রতিবন্ধকতা কাজ করছে - থাক না কি হবে লিখে ? আর কয়েকজন ইতিমধ্যে এ সব বিষয় নিয়ে লিখে স্টার হতে গিয়ে শয়তানের প্ররোচণার ফাদে পড়ে খাঁদে পড়েছেন সে বিষয়টাও মাথায় ঘুরতে পারে।।

 

আমার কাছে অনেকেই জানতে চাচ্ছেন - ভাইয়া কি করবো ? , কিভাবে প্রিপারেশন নিবো ? কি পড়বো ? কিভাবে পড়বো ? কোথা থেকে শুরু করব ? আমার দ্বারা কি হবে ? 
তাদের জন্য আমার এই লেখা ।

 

তার আগে আমারে নিয়ে দু চার লাইন -

আমার জীবনের জবের জন্য প্রথম ভাইভা ছিলো - ১০ ম বিজেএস এর ভাইভা আর ২য় ভাইভা ছিলো ৩৬ তম বিসিএর এর ভাইভা । আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি দুটোতেই সফলকাম হলাম । ১০ ম বিজেএস এ আশা করি আগামী ডিসেম্বরে গেজেটেড হবো৩৬ তম বিসিএস এ এডমিনিস্ট্রেশন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হলাম। 
আমার কিন্তু কোন কোটা নাই আবার কৌটা ও নাই । এবং ৩৬ তম বিসি এস আমার লাইফের প্রথম বিসিএস এবং ১০ ম বিজে এস আমার লাইফের প্রথম বিজেএস।

 

আমি ২০০৭ - ০৮ ব্যাচে ঢাবির আইন বিভাগে ৩৫ তম ব্যাচে ভর্তি হই । খ ইউনিটে আমার মেধাস্থান ছিল ৬ষ্ঠ , ঘ ইউনিটে ১০ম এবং সেসময় আই্ ই আর আলাদা পরীক্ষা হতো ,, সেখানে ২য় হয়েছিলাম । আর অন্যান্য অনেক ভার্সিটিতে প্রথম দিকেই ছিলাম।ঢাবিই ছিলো আমার টার্গেট । সো ঢাবিতেই ভর্তি হয়েছিলাম । কিছু কারনে আমি দীর্ঘ তিনবছর পড়াশুনা থেকে দূরে থাকি ।আমি সে বিষয়টা নিয়ে আরেকটা পোস্ট দিবো - ইনশাআল্লাহ । অবশেষে ২০১২ সালে আইন বিভাগের ৩৮ ব্যাচের সাথে পুন:ভর্তি হয়ে ২০১৫ সালে অনার্স এবং ২০১৬ সালে মাস্টার্স শেষ করি । ২০১৬ সাল আমার জীবনের সবচেয়ে ব্যস্ততম বছর । এ বছর আমার জীবনের সোনালী সময় । একদিকে মাস্টার্সের পড়াশুনা, থিসিস , কোর্ট প্রাকটিস, টিউশনি , অনলাইনে কাজ আর অন্যদিকে ২ টা বিসিএস , ১টা বি জে এস এর পড়াশুনা। এত্ত কিছু, এত্ত কিছু কাজ আর পড়াশুনার চাপ যে , ব্রেনের যত জং সব ঘষেমেজে পরিষ্কার।

 

এখন আপনি যদি আমার কাছ থেকে পরামর্শ শুনতে চান তবে - 
আপনার জন্য আমার কিছু কথা ....

১) পজিটিভ কথা বলুন ,, এখন থেকেই

আমি ছাত্র হিসেবে অদম্য মেধাবী ছিলাম না কোনদিন । তবে ঢাবিতে আইন বিভাগে পড়ার সুবাদে অনেক অদম্য মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের দেখা পেয়েছি। নিজের মধ্যে অদম্য স্পৃহা তৈরি করে নিয়েছি সফলতার । আমি ইতিবাচক বলতে ভালোবাসি , ইতিবাচক কাজ করতে ভালোবাসি । আপনাকে যখন কেউ বলবে - পড়াশুনা কেমন চলছে ? -। আপনি নির্দ্ধিধায় বলবেন - আলহামদুলিল্লাহ ভালো চলছে ।  কখনো বলবেন না - নারে, ভাই পড়াশুনা হচ্ছে না , সময় পাচ্ছি না , এই সমস্যা- সেই সমস্যা । নেগেটিভ কথাই বলবেন না। ধরেন, আজ সারাদিন আপনি বই নিয়ে বসার সময় পান নাই - তবু ও এই কথা বলবেন না। 


আপনি হয়তো আজ সারাদিন ক্যাম্পাসের আনাচে - কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন আর বাদাম এর খোসা ছাড়ানোর কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন নিজেকে তবু ও কারো সাথেই বলবেন না যে আপনার পড়াশুনা ভালো হচ্ছে না । যে-ই আপনার কাছে পড়া শুনার বিষয়ে জিজ্ঞেস করবে আপনি রেডিমেট উত্তর দিবেন যে - চলতেছে ভালোই ।  এটা কি মিথ্যা কথা বলা হলো না ? - না , কারণ আপনি সারাদিনে কি মোবাইলে দুটো লাইন পড়েন নাই , ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে চিকামারা থেকে দুটো লাইনে চোখ মেলে তাকান নাই ?- তাকিয়েছিলেন ? তাহলে ? কথাটাতো মিথ্যা নয়।  কেন বলবেন এই কথা ?

 
- পজিটিভ কথাটা একটা মারাত্মক বিধ্বংসী ইতিবাচত দ্বিমুখী ক্ষেপনাস্ত , এটা আপনার মনের নেগেটিভ দুর্গকে আগাত করে করে মনের শক্তি , ব্রেনের শক্তি বাড়ায় আবার যারে বললেন তার মনের খারাপ ভাইরাসগুলোকে ও নষ্ট করে এবং তার মনে ও একটা পজিটিভ ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে।  এ বিষয়ে আরো অনেক বক বক করা যাবে । আর করলাম না। বুঝে নিন বাকিটা .. সো - অলওয়েজ পজিটিভ কথা বলুন।লজ্জা শরম ছেড়ে দিয়ে বলুন। আপনার বন্ধু আপনার এই কথা শুনে আপনাকে যাই বলুক তাতে আপনার কিচ্ছুটি যায় আসে না। বরং সে যখন একাকী গভীর রাতে চিন্তা করবে তার ব্রেণ ও সিগনাল দিবে তাকে পড়তে হবে আর আপনার বেন তো সিগন্যাল দিবেই অলওয়েজ যে - আমাকে পড়তে হবে , আমাকে পড়তে হবে। সো শত্রুর সাথে ও পজিটিভ বলুন .. নিজের সাথে ও বলুন ..

Talk Positive, Walk Positive and Be Positive ...

 

২) প্রথম থেকেই শুরু করুন -

আমি গ্রামের ছেলে । নার্সারী / কেজিতে পড়িনি , শিশু ওয়ানে পড়েছি । আমি শিশু ওয়ান থেকে যা যা পড়েছিলাম তা রিভিশন দিয়েছিলাম। শিশু ওয়ান থেকে রিভিশন শুরু করুন।  ” জল পড়ে পাতা নড়ে” - কথা টা আবার একটু মন দিয়ে পড়ে দেখেন তো .. সত্যিই আপনার মনের মধ্যে জল পড়ে কিনা ? এবং সত্যিই পজিটিব থিংকিং এবং ইচ্ছা টা পাতা নড়ার মত দুলে দুলে আপনাকে সাহসী করে তোলে কিনা ?
আপনি বিসিএস দিবেন ১৩ এর নামতা পারেন ? ১৭ এর নামতা বা ২৩ এর নামতা ?

৩০ পর্যন্ত নামতা মুখস্থ করে ফেলুন । ভাবতেছেন - এটা একটা ফালতু কাজ , জ্বি এই কাজটা আমি করেছি ,,  Ba বা Be বে Bi বি Bu বু Bo বো - এধরনের উচ্চারণ করার একটা বই ছিলো শিশু ওয়ানে ওটা আরেকবার রিভিশন দেন মন দিয়ে । ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস টেনের সবগুলো বই এর হার্ড কপি বা সফট কপি জোগাড় করুন ,, ক্লাশ ওয়ান আগে শেষ করুন তারপর ক্লাস টু এভাবে ।  আপনি দেখবেন অনেক নতুন জিনিস নতুন ভাবে বা অনেক পুরানো জিনিস নতুনভাবে উদ্ভাসিত হচ্ছে আপনার কাছে । নিজের সাথে নিজে ফান করুন এত্ত সুন্দর সুন্দর কথা আপনি নিচের ক্লাসে পড়েছিলেন কিন্তু তখন বুঝেন নি এই কথা বলে। কি বোকা ছিলেন ছোটবেলায় আপনি ?

ব্যাকরণ / গ্রামার যতটুকু যে ক্লাশ আছে তা পুরোটাই বুঝে বুঝে পড়তে থাকুন , না বুঝলে চলে যান প্রাইমারি বা মাধ্যমিক শ্রেনীর শিক্ষকদের কাছে।

 

৩) পড়াটাকেই গানের মত ব্রেনে ঘুরান সবসময় -

আপনি ওয়াশরুমে / বারান্দায় / ছাদে ?  একটু আগে কি পড়েছিলেন ? ব্রেনে আনার চেষ্টা করুন । যেখানেই থাকুন কিছু আগে যা পড়েছিলেন সেটা মনে আনার চেষ্টা করুন। রণে -বনে - জলে - জংগলে যখন যেখানে সে অবস্থায় থাকবেন আপনার কাছে থাকবে মহামূল্যবান বই বা বাইয়ের খন্ডিত অংশ বা চিরকুট এবং কিছুক্ষণ পরপর আপনার চোখ সেখান থেকে সুধা পান করবে।

 

৪) NO SONG, NO MOVIE, NO LIVE MATCH

গান, নাটক, এফ এম, মুভি, বিভিন্ন খেলাধূলার লাইভ ইত্যাদি ব্রেনের বড় অংশকে অকেজো করে দেয়। এগুলো থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকুন । শুধু মাত্র এসব বিষয়ে ইনফরমেশন সংগ্রহ করুন। দিনে সবোর্চ্চ এক ঘন্টা বিনোদনের জন্য রাখুন - পজিটিভ গান বা কিমেডি জাতীয় / হাসির / মজার কিছু শুনতে বা দেখতে পারেন । দুঃখবিলাসী সবকিছু পরিত্যাগ করুন। দুঃখসাগরে নিমজ্জিত বন্ধু বান্ধব কে ও দূরে রাখুন।  যখন গান ‍শুনবেন আনমনে বা অবহেলায় শুনবেন না , পুরো মনযোগ দিয়ে শুনবেন । কমেডি দেখলে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পরবেন। গান বাজতে থাকবে আর আপনি পড়তে থাকবেন এটা আমার কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর( আপনার পছন্দ আমার সাথে নাও মিলতে পারে)

 

৫) সর্বগ্রাসী হোন - ( পজিটিভ বইয়ের ক্ষেত্রে)

সামনে যে বই পাবেন তাই উল্টে পাল্টে দেখবেন । কোন বিশেষ কোম্পানীর / লেখকের বইকে অতি বিশেষ ভক্তি দেখাবেন না আবার কোন বিশেষ লেখকের বইকে শত্র / দূর্বল ভাববেন না।

 

৬) অস্ত্র এবং গোলাবারুদ সংগ্রহ করুন এবং লিস্ট করুন -

আপনি সম্ভাব্য সকল অস্ত্র ধীরে ধীরে ( নট একদিনে ) যোগাড় করুন । এবং একটা লিস্ট করুন । প্রতিটা অস্ত্রে প্রতিদিন দু মিনিট হলেও হাত বুলান । আপনি ভেবে ভেবে একটা লিষ্ট করুন / রুটিন করুন যাতে আপনার প্রতিদিন প্রত্যেকটা অস্ত্রেই হাাতের মৃদু ছোয়া লাগে। স্টাডি ম্যটিারিয়াল যত বেশি আপনার হাতে থাকবে তত বেশি আপনার কানফিডেন্স গ্রো করবে।

 

৭) যখন যেটা পড়তে মন চাইবে তখন সেটাই পড়বেন -

জোর করে কোন কিছু পড়ার বা লেখার চেষ্টা করবেন না্। যখন যে বই পড়তে / লিখতে ভালো লাগবে তখন সেইটা পড়েবন । ভালো না লাগা শুরু হলেই বইটা চেঞ্জ করবেন এবং আরেকটা শুরু করবেন। ধরুন, আপনি একটা ডেইলি রুটিন করেছেন , যেখানে সকাল ৯ টায় আপনার অংক করার কথা. কিন্তু ৫ মিনিট অংক করার পর আপনার আর ভালো লাগে না। আপনি সাথে সাথে অংক চেঞ্জ করে অন্য বই হাতে নিন। তবে যদি কোন কিছুই আপনার ভালো না লাগে তবে বিসিএস আপনার জন্য নয়। আমি কোন রুটিন করে পড়ালেখা করিনি । আমি সবগুলো ম্যাটারিয়াল এর একটা তালিকা তৈরি করেছিলাম । এবং প্রতিদিন তালিকাটার সবগুলো ম্যাটারিয়াল টাচ করার চেষ্টা করতাম । কোন ম্যাটারিয়ালের জন্য ২ মিনিট আবার কোনটার জন্য ২০ - ৩০ মিনিট সময় দিতাম যেদিন মন যতটুকু চাইতো ।

 

৮) ইংরেজি ডিকশনারী এবং বাংলা অভিধান -

আছে তো ? অনেকের নাই । না থাকলে কিনে ফেলুন বড় সাইজের । প্রতিদিন ডিকশনারি পড়ুন । যেমন ধরুন, Go একটা ওয়ার্ড । এই ওয়ার্ড নিয়ে ডিকশনারির ভিতরে অনেক আলোচনা আছে সবটাই পড়ে ফেলুন।এই শব্দটার নানামুখী usage টা শিখুন । এই শব্দ দিয়েই অনেক Phrase, Idioms হয় সেগুলি বুঝে বুঝে শিখুন , একই শব্দ অনেক parts of speech এর কাজ করতে পারে সেটাও শিখুন ।

 

৯) অনেকের পরামর্শ শুনবেন না। -

সারাদিন শুধু পরামর্শ শুনতে ব্যয় করেন , মোটিভেশনাল স্পিস শুনতে চান কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করতে ভালো লাগে না্ ? অনেকটা সারারাত ওয়াজ শুনতে ভালো লাগে কিন্তু ফজরের নামাজ পড়তে ভালো লাগে না টাইপ ।
এত্ত ওয়াজ নসিহত শুনা বাদ দেন । নিজে থেকেই নিজের ব্রেন কে জিজ্ঞেস করে পথচলা শুরু করুন । বিশ্বাস করুন । আমি কোন বড়ভাইকে কোন সাজেশান চেয়ে মেসেজ দেই নাই । কোন মোটিভেশনাল স্পিস শুনতে যাই নাই। 
বই পড়ে যতটুকু জেনেছি ওইটাই । সো নিজেই নিজের পরামর্শক হোন ।

 

১০) নিজেকে সকসময় ব্যস্ত রাখুন -

ইতিবাচক কাজে সবসময় নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। শারীরিক সমস্যা থাকলে সেটা দূর করার চেষ্টা করুন এখুনি । এবং মানসিক কোন পিছুটান থাকলে সেটা ও দূর করে দেন চিরতরে । হাতে সবসময় স্টাডি ম্যাটারিয়াল রাখবেন । ১০ মিনিট পড়বেন তারপর ৩ মিনিট রিভিশন দিবেন । হেটে হেটে রিভিশন টা দেওয়ার অভ্যাস করবেন। যেখানেই যাবেন স্টাডি ম্যাটারিয়াল সংগে রাখবেন। ছোট্ট চিরকুট টাইপ কিছু হলেও রাখবেন ।

 

১১ ) বিশ্বাস এবং ভরসা রাখুন আল্লাহতে এবং নিজের উপরে -

দরকার হলে দুদিন নিরবে একাকী - নিজর্নে ভাবুন , তারপর নিজের সবকিছু বিবেচনা করে দেখুন আপনি পারবেন কিনা ? মন থেকে - উত্তর ইতিবাচক হরে সামনে অদম্য গতিতে এগিয়ে যান । নইলে এখনই থেমে যান । বিসিএস আহামরি কোন কঠিন কিছু নয় - এই বিশ্বাস নিজের ভেতর রাখুন।

ধন্যবাদ । - Ibrahim Khalil Muhim, Admin Cadre (Recommended), 36th BCS