চারিদিকে সফলতার গল্প পড়তে পড়তে চোখ পচে গেছে। টেক আইকন, মুভি ষ্টার, বা ফুটবল খেলোয়ার সবাই যেন মায়ের পেট থেকে বের হয়েই কোটি কোটি টাকা আর লাখ লাখ ভক্ত পেয়ে গেছেন। কিন্তু বাস্তবতা মোটেই এরকম নয়। তারাও আপনার-আমার মত সাধারন মানুষ। তারাও হাসে, বাথরুমে যায়, ভুল করে বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদে। কিন্তু যে সকল জিনিস আমাদের মত সাধারন থেকে তাদেরকে আলাদা এক উচ্চতায় নিয়ে যায় তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন আমার মনে হয়, তারা ব্যর্থতা কিভাবে নেয়, ভুল থেকে কিভাবে শেখে সেটা। আমার এইসব গল্প পড়তে খুব ভাল লাগে। নেট ঘেঁটে এসব খুঁজে বের করাও এমন কোন হাতি-ঘোড়া ব্যাপার নয়। 

 

জেফ বেযস (Jeff Bezos), অ্যামাজন ডট কমের ফাউন্ডার এবং সি ই ও, পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী লোকগুলোর একজন, ফরচুন যাকে বলে “Businessperson of the Year” (২০১২) আর টাইম ম্যাগাজিনের মতে “Person of the Year” (১৯৯৯)। তার কোম্পানীর ২০১৪ সালের রেভেনিউ ৭৫ বিলিয়ন ডলার আর কোম্পানি ভ্যালুয়েশন ১৫০ বিলিয়ন ডলার যা ইকমার্স কোম্পানির মধ্যে ২য় অবস্থানে (১ নম্বর আলিবাবা)। আর আমি কী না এসেছি সেই ভদ্রলোকের ব্যর্থতার গল্প শোনাতে! জানলে অবাক হবেন, আমি-আপনি আমাদের জীবদ্দশায় যত ভুল করেছি/করবো, বেযস একা অ্যামাজনের শুরুর দিকে তার চেয়ে বেশি ভুল করেছেন!!

 

জেফ বেযস

১৯৯৮ সালে অ্যামাজন বই, মিউজিক আর মুভি বিক্রি করে এই ক্যাটাগরিগুলোতে নাম্বার ওয়ান অনলাইন ষ্টোর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, ভেঞ্চার ক্যাপিটালিষ্টরা কোম্পানি তে ইনভেষ্ট করতে আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকে আর বেযস তার সারাজীবনের স্বপ্ন অ্যামাজনকে “everything store” করার পথে হাটতে থাকেন।

অনেক গবেষনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন ‘বাচ্চাদের খেলনা’ হবে নতুন আইটেম। এইটা অ্যামাজনের কোর বিজনেস থেকে একটু আলাদা ছিল কারন সে সময় খেলনা’র সে রকম কোন ডিস্ট্রিবিউটর ছিল না। তাই অ্যামাজনকে ম্যানুফেকচারার থেকে ডিরেক্ট কিনতে হতো, তারপর ইনভেন্টরি ষ্টোর করে দোয়া করতে হত যেন সব খেলনা বিক্রি হয়! অ্যামাজনের বাকি সব এক্সিকিউটিভরা বিরোধিতা করলেন, কিন্তু বেযস নাছোড়বান্দা, ফলাফল হাতে নাতে পেলেন। ১২০ মিলিয়ন ডলারের খেলনা কেনা হয়েছিল, ক্রিষ্টমাস শেষে ৫০ মিলিওয়ন ডলারের খেলনা অবিক্রিত পড়ে রইলো। রাখার কোন জায়গা নাই, আর বিক্রির কোন গ্যারান্টি নাই। শেষে উদ্ধার পাওয়া গেল বিভিন্ন চ্যারিটি তে দান করে আর কিছু অংশ অর্ধেক দামে এক্সপোর্ট করে!জেফ বেযস

 

জেফ বেযস

একই বছর বেযস শুরু করেন Amazon Auctions, তার মতে যেটা eBay কে টেক্কা দেবে। জেফ ১৭৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে Accept.com কিনে নেন এই প্রজেক্ট ফ্যাসিলেটেট করার জন্যে কিন্তু ফল হল অশ্বডিম্ব। eBay তখন অলরেডি এষ্টাব্লিসড, Amazon Auctions পাত্তাই পেল না! খেলনা প্রজেক্টের চেয়েও ফেইলুর হিসেবে তখন এই প্রজেক্ট প্রতিষ্ঠিত।

১৯৯৮ সালে বেযস Junglee কিনেন, একটি সার্চ সাইট যেটা ওয়েব প্রডাক্টসের প্রাইস কম্প্যার করে। ১৭০ মিলিওয়ন ডলার খরচ হয় এটার পেছনে কিন্তু বোর্ড খুব খুশি হতে পারেন নাই কারন তাদের মতে এটা ভিজিটরকে অন্য সাইটে নিয়ে যায়।

১৯৯৮-৯৯ সময়টা ছিল বেযসের চূড়ান্ত পাগলামির সময়। এ সময় উনি কিনেন মুভি সাইট IMDB.com, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং কোম্পানি PlanetAll.com, ডাটা কোম্পানি Alexa.com, একটা জার্মান আরেকটা ব্রিটিশ বুক ষ্টোর। তিনি আরো ইনভেষ্ট করেন ড্রাগষ্টোর, পেট ষ্টোর, ওয়াইন শপ, গ্রোসারি! মানুষের কাজ করার একটা ক্যাপাসিটি আছে। সব খাবার একবারে খেলে যা হয় তাই হলো, বদহজম, মোটামুটি সব ইনভেষ্টমেন্ট জলে গেল।

মজার ব্যাপার হলো, বেযস মনে করেন এগুলো একটাও বাজে ডিসিশন ছিল না, ভুল ইনভেষ্টমেন্ট তো নয়-ই। উপরের ইনভেষ্টমেন্ট গুলোতে অ্যামাজন হয়তো কিছু লস করেছে কিন্তু লাভের পাল্লাই কিন্তু ভারী। Google, AirBNB, and Uber এগুলোও কিন্তু বেযস এরই পছন্দ ছিল। আরো কিছু গ্র্যান্ড সাক্সেস হলোঃ Zappos, ShopBop, and Diapers.comজেফ বেযস

 

জেফ বেযস

এটা ঠিক যে বেযস বিলিয়ন ডলার নষ্ট করেছেন, কিন্তু প্রত্যেকটা ভুল থেকে উনি শিখেছেন আর অ্যামাজনকে বানিয়েছেন তার স্বপ্নের “everything store”। খেলনার ভুল থেকে তিনি যে শিক্ষা পেয়েছেন তা কাজে লাগিয়ে উনি Toys “R” Us এর সাথে পার্টনারশিপ করে এগিয়েছেন যাতে অ্যামাজনকে ইনভেন্টরি নিয়ে মাথা না ঘামাতে হয় আর সেলস এর দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। প্রত্যেকটা ভুল থেকেই উনি শিখেছেন আর কাজে লাগিয়েছেন যেটা অ্যামাজনের সফলতার সবচেয়ে বড় কারন।জেফ বেযস

পরবর্তী লেখায় অন্য কোন সেলিব্রিটির ব্যার্থতার গল্প শেয়ার করব।