পৃথিবীর জ্ঞান ভান্ডার এককভাবে যারা সমৃদ্ধ করেছেন, স্টিফেন হকিং তাদের মধ্যে জ্বলজ্বল করা এক নাম। জীবিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা প্রতিভাধরদের একজন। Oxford এবং Cambridge-এর গ্রাজুয়েট হকিং ডজন খানেক সর্বোচ্চ সম্মানে সম্মানীত। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় বই A Brief History of Time এর মাধ্যমে তিনি ফিজিক্স, এষ্ট্রোনমি এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে সবার কাছে জনপ্রিয় করেছেন। তাঁর বই বোঝার জন্যে আপনাকে ফিজিক্সের অধ্যাপক হতে হবে না, আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান এটা মনে হয়।


কিন্তু তিনি যে সর্বকালের সেরাদের একজন সেটা কিন্তু শুরুতে বোঝা যায়নি। Oxford এ লেখাপড়া করার সময় তিনি ‘যথেষ্ট’ পরিশ্রম করেননি এটা নিজেই স্বীকার করেন। তাঁর ভাষায় পুরো ৩ বছরের শিক্ষা জীবনে তিনি মাত্র ১০০০ ঘন্টার মত সময় দিয়েছিলেন লেখাপড়ার পেছনে, গড়ে প্রতিদিন মাত্র ১ ঘন্টা! ফলস্বরুপ তাঁর ফাইনাল রেজাল্ট খুব ভাল হয় নাই, ফার্স্ট এবং সেকেন্ড ক্লাসের মাঝে দোদুল্যমান অবস্থা, অবশেষে তাকে ফার্স্ট ক্লাস দেয়া হয়ে যখন তিনি কমিটিকে কনভিন্স করেন এই বলে যে, ফার্স্ট ক্লাস পেলে তিনি Cambridge এ রিসার্স করবেন।

যেন কথা রাখতেই হকিং Cambridge এ এনরোল করেন ১৯৬২ সালে। কিন্তু ঠিক এই সময় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে আসলো এক মরনব্যাধি, মেডিকেলের ভাষায় amyotrophic lateral sclerosis (ALS)। ডাক্তাররা জানালেন এ রোগের কোন চিকিতসা নেই বরং অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হবে, বড় জোর দুবছর বাঁচবেন!

 

স্টিফেন হকিং স্টিফেন হকিং


যখন হকিং প্রথম হাসপাতালে ভর্তি হলেন তখন তাঁর চোখের সামনে একটি ছেলে লিউকোমিয়ায় মারা যায়। এই ছোট্ট ঘটনা তাঁর মনে অনেক বড় প্রভাব তৈরী করে, তিনি ভাবতে থাকেন যে তিনিই একমাত্র অভাগা নন, তাঁর চেয়েও খারাপ অবস্থায় অনেকেই আছেন। এরপরে জীবনের সকল খারাপ অবস্থায় হকিং ঐ ছেলেটির কথা স্মরন করেছেন। এক অর্থে সমস্ত পৃথিবী ঐ লিউকোমিয়ায় মৃত ছেলেটার কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

আমার-আপনার মতন ‘আমার সাথেই কেন এমন হয়’ না ভেবে হকিং কঠোর পরিশ্রম শুরু করলেন কারন তাঁর হাতে সময় বেশি নাই। জেনে আশ্চর্য হবেন যে, তাঁর বেশিরভাগ সায়েন্টিফিক অবদান ALS ধরা পরার পরের সময় করা!
যদিও হকিং নিজেকে অসুস্থ্য মনে করতেন না, আদতে ALS কিন্তু ভয়ংকর রোগ। ১৯৮৫ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলেন হকিং, ডাক্তাররা তাঁর জীবনের আশা ছেড়ে দিলেন কিন্তু হকিং ঠিকই ফিরে আসলেন যদিও নিউমোনিয়া তাঁর কথা বলার ক্ষমতা চিরতরে নিয়ে গেল (আগে থেকেই টাইপ করার ক্ষমতা ছিল না)। এই ঘটনা যখন ঘটে তখন তিনি A Brief History of Time লেখার ঠিক মাঝখানে।

 

স্টিফেন হকিং স্টিফেন হকিং


আপনি কী করতেন, যদি আপনার লেখার এবং বলার ক্ষমতা না থাকতো তাইলে কী ২৫০ পৃষ্ঠার একটা সায়েন্স বুক লেখার চেষ্টা আপনি করতেন?

কিন্তু হকিং করেছেন, একটা কম্পিউটার প্রোগ্রামের সহায়তা নিয়ে যা দিয়ে মিনিটে মাত্র ৩ টি শব্দ লেখা যেত। এই প্রোগ্রামের সহায়তায় হকিং শুধু A Brief History of Time শেষ করেননি আরো ৭ টি বই এবং অসংখ্য একাডেমিক আর্টিকেল লিখেছেন।

হকিং তাঁর কর্মযজ্ঞ ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘যখন আপনি জানেন যে আপনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না তখন আপনি বুঝতে পারবেন জীবন কত গুরুত্বপূর্ন’। তাঁর মতে শারিরীক অক্ষমতা বরং তাঁর কাজের জন্যে আরো বেশি সহায়ক হয়েছে কারন তাকে আন্ডারগ্র্যাড ছাত্রদেরকে শেখাতে হয় না, তদন্ত কমিটিতে বসতে হয় না, আর এর ফলে পুরো সময়টা তিনি রিসার্সে দিতে পারেন।

জীবনে কোন বাঁধা আসলে আমরা হাল ছেড়ে দেই, ভাবি, এটা আমার জন্যে নয়। কেউ কেউ আবার দরজা বন্ধ করে কাঁদি, ‘হোয়াই মি!’ কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা প্রতিনিয়ত নিজেকে এবং চারপাশের বাঁধাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁরা বলেন না, ‘হোয়াই মি’, বরং বলেন, ‘ট্রাই মি’!

ব্যক্তিগত জীবনে হকিং ৩ সন্তান নিয়ে সুখি। আর এ জন্যেই হয়তো এই মরনব্যাধি নিয়েই তিনি ৫০ বছরের উপর বেঁচে আছেন। ভাগ্য চেষ্টার ত্রুটি করে নাই কোন, কিন্তু তিনি একটুকু ছাড় দেননি, তাই তো তিনি বলতে পারেন, “it has been a glorious time to be alive”
.
.স্টিফেন হকিং

পাদটিকা ১- স্টিফেন হকিং একজন নাস্তেক বলোগার। প্রথমদিকে অনেক ধোয়াশা করলেও ২০১৪ সালে নিজেকে একজন Atheist হিসেবে ঘোষনা করেন।

পাদটিকা ২- যারা Pink Floyd এর Keep Talking গানটা শুনেছেন তারা খেয়াল করলে জানেন নিশ্চই যে ওইখানে হকিং এর ভয়েস ইউজ করা হয়েছে।স্টিফেন হকিং