কানাডা মাইগ্রেশনের সুযোগ, প্রিপারেশন, প্রসেসিং এবং সফল সেটেলমেন্ট নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা, গুজব, ভয় এমনকি উচ্চাভিলাষী ভাবনা আমাদের মধ্যে হরহামেশাই কাজ করে।

১০ পর্বের ধারাবাহিক ফিচার লিখছি আপনাদের জন্য আশাকরি অনেকেই উপকৃত হবেনঃ...

পর্ব ০৩ঃ কানাডায় চাকুরী সমাচার?

চাকুরী কি কানাডাতেও সোনার হরিন? আসনে কি পরিমান মানুষ কানাডায় হোমলেস (বাড়িঘর নাই) তার একটা উদাহরণ দেই। প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ কানাডায় হোমলেস থাকে। ২,৩৫,০০০ সংখ্যাটা খুব নগন্য লাগছে? কানাডা বাংলাদেশের চাইতে ৬৭ গুণ বড় আর লোকসংখ্যা? ইয়ে মানে বাংলাদেশে বাংলালিংকের যে পরিমাণ গ্রাহক আছে পুরো কানাডাতেও এই পরিমাণ আদম নাই! শুধু কি তাই? আরো প্রায় অতিরিক্ত ৫০,০০০ লোক প্রতি বছর হোমলেস থাকে যারা আবার চুপা রুস্তম ক্যাটাগরির হোমলেস!

কিন্তু সে আবার কেমন?

এই ধরেন মাইন্সের বাসায় থাকে, ভাই ব্রাদারগো, মামা, চাচা এবং কি কাউচসার্ফিং (অবশ্যই গুগল করে বের করবেন এইটার মানে কি) করেও দিনের পর দিন পার করা আদমও এখানে আছে।

তাহলে সরকার কি করে?

গড়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা কানাডিয়ান সরকার প্রতি বছর ব্যয় করে এই হোমলেস মানুষদের ম্যানেজ করার জন্য!

তাহলে কি কানাডা কি বাস যোগ্য?

আসেন একটু পরিসংখ্যান নিয়ে ঘাটাঘাটি করি।

 

- আপনি কানাডা না থেকে বাংলাদেশে থাকলে ১১ বছর আগেই মারা যাবেন। (ভাই হায়াত মউত আল্লাহর হাতে, আমি শুধু পরিসংখ্যান এর কথা বললাম)

- হাসপাতালে দৌড়াইতে দৌড়াইতে বান্দা কাহিল। মুহতারামে হাজিরিন উইনাটেড/এপোলো/আর স্কোয়ারে আমরা কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালি কারন সবার আগে জীবন। এখানে ঔষধ কিনে খেতে হলেও আপনি যদি কানাডা আসেন তাহলে হাসপাতাল খরচের শতকরা ৯৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ টাকা কানাডা সরকার আপনাকে সুস্থ করতে ব্যয় করবে।

- আপনি কানাডা আসলে আপনি খুন হওয়ার সম্ভাবনা ২ শতাংশ কমে যাবে (এখন ভেবে দেখেন বাংলাদেশে কি পরিমাণ মানুষ প্রতিদিন খুন হয়)

- আপনি কানাডা আসলে গড়ে এখন যা টাকা কামান তার চাইতে ৯৫ শতাংশ বেশী কামাতে পারবেন (খরচটাও কিন্তু সে হারে বাড়বে)

 

 

কিন্তু চাকুরী?

ধরুন আপনি বাংলাদেশের স্বনামধন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন থেকে সুনামের সাথে কাজ করছেন। শুধু আপনার কোম্পানিতেই না বরং পুরো ইন্ডাস্ট্রিতেই আপনার বেশ নাম ডাক। এবার একটু ভেবে দেখুন, বাংলাদেশেই কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনি একটা ইমেইল পেলেন যার বিষয় বস্তু আপনাকে কোম্পানী থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে!

নিঃসন্দেহে এই আপনি এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। গড়পড়তা বেশীরভাগের মানুষেরই প্রথম যে চিন্তা মাথায় আসবে তা হলো আগামী মাস থেকে বাসা ভাড়া দিবো কিভাবে? সদাই পাঁতির খরচ কিভাবে ব্যবস্থা করবো? লোনের ইন্সটলমেন্ট? ক্রেডিট কার্ডের বিল? বাচ্চার পড়াশোনা? বাবা মার খরচ? ইত্যাদি ইত্যাদি...

 

আপনার বর্তমান স্ট্যাটাস আপনি পরীক্ষিত কিন্তু বেকার? আপনার কি মনে হয় আপনি চাইলেই পরের দিন থেকে অন্য আরেকটি কোম্পানীতে যোগদান করতে পারবেন? উত্তরটা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই না! যদি নিজের চেনা জানা শহরে, পরিচিত মানুষের ভিড়ে চাকুরী পেতে বেগ পেতে হয় তাহলে আমাদের কি এমন ভাবনা থাকা উচিৎ যে নতুন এক দেশে, ভিন্ন পরিবেশে, হেঁসে খেলে আমি চাকুরী পেয়ে যাবো?

 

বাস্তবতা এখানে ভিন্ন!

আসুন কানাডার চাকুরী বাজার নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রথম কথা, কানাডায় যে পরিমান চাকুরী আছে তা বাংলাদেশের তুলনায় অঢেল! আই রিপিট অঢেল। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রিপারেশন আর মার্কেট এনালাইসিসে নজর না দিলে এই অঢেল চাকুরীর বাজারেও আপনাকে হাবুডুবু খেতে হবে। তার চাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এটিটিউড আর নিজেকে মানিয়ে নেয়ার মানসিকতা সাথে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের নার্ভ শান্ত রাখাও সমান পরিমানে ইম্পরটেন্ট।

 

রিসার্চ?

হুম, বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ ভালো চাকুরী ঢাকা কেন্দ্রিক। আরো একটু ভেঙ্গে বললে উত্তরা থেকে মতিঝিল এর মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ। কানাডা মোটেও ছোট কোনো দেশ না, একটু ভূগোল নিয়ে নাড়াচাড়া করলে দেখবেন কানাডা বাংলাদেশের থেকে ৬৭ গুণ বড়! আই রিপিট ৬৭ গুণ!! কানাডা উন্নত দেশ, এখানকার ইনফ্রাস্ট্রাচার অত্যন্ত গোছানো আর চাকুরীর ক্ষেত্রেও তাই।

 

তাহলে সমস্যা কোথায়?

হুম, এবার আসি আসল কথায়। বাংলাদেশে একটা সময় বলা হতো মামা চাচা ছাড়া চাকুরী পাওয়া নাকি ক্লোজ টু ইম্পসিবল! যদিও এখন আর সেই দিন নাই। কিন্তু এই মুল্লুকে মামা চাচা ছাড়া উপায় নাই!

হোয়াট? আর ইউ কিডিং মি?

জি ভাই, এখানের প্রায় ৭০ শতাংশ চাকুরী হয় রেফারেন্সে। উঁহু, বাংলা রেফারেন্স না কিন্তু? তাহলে?

আচ্ছা আপনি নিজেই একবার চিন্তা করে দেখেন ৩০ মিনিটের একটা ছোট্ট ইন্টারভিউ দিয়ে একজন চাকুরী প্রার্থীকে যাচাই বাছাই করা আসলে সম্ভব? আপনে আমি বাংলাদেশের যতভালোই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি না কেন তার কোনোটাই বিশ্ব র‍্যাঙ্কিং এ ধারে কাছে নাই! ব্যাপারটা অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য। কানাডায় রেফারেস্ন অত্যন্ত স্বীকৃত এবং বহুল প্রচলিত সিস্টেম যার মাধ্যমে বেশীরভাগ বড় বড় কোম্পানী নতুন কর্মী রিক্রুট করে থাকে। ইয়ে মানে, ব্যাপারটা এমন না যে আপনি মামা চাচা ধরলেন কিংবা বড় হোতা মোতা দিয়া ফোন করাইবেন আর কাম হইয়া যাইবো তা না! সব কিছুই এখানে সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়!

 

তাহলে? হুম, একটা উদাহরণ দেই, কানাডার সবচাইতে বড় মোবাইল ফোন অপারেটর হচ্ছে “বেল” বা সব চাইতে বড় ব্যাংক হচ্ছে “আরবিসি”। ধরে নিলাম আপনার টার্গেট হচ্ছে বেল বা আরবিসি তে যোগদান করা। আপনার চাকুরীর অভিগ্যতা, ফরলাম এডুকেশন আর ট্রান্সফারেবল স্কিল পুরোদমে যে পজিশন অফার করা হয়েছে তার সাথে মিলে যায়। শয়ে শয়ে চাকুরী প্রার্থীর মতও আপনিও এপ্লাই করলেন। মুহতারামে হাজিরিন, আপনার সিভি পিক হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত নগ্যন্য। খুব সিম্পল, একটা পজিশনের এগেইন্সটে যদি ১০০০ সিভি জমা হয় কোনো হায়ারিং ম্যানেজারের বাপেরও সাধ্যি নাই এখানে থেকে আতসি কাচ দিয়ে খুজে টপ ৫টা সিভি আলাদা করার!

 

 

তাহলে?

টোটকা নাম্বার ১ঃ এখানে বেশীরভাগ কোম্পানীতে চাকুরীরত এমপ্লইরা চাইলেই তার পরিচিতজন কে জব ওপেনিং এর এগেইন্সটে রেফার করতে পারেন। সেটাও আবার সিভি প্রিন্ট করে এইচআর এর ডেস্কে রেখে আসা না জনাব! ঐ যে বললাম, সিস্টেম। হুম, ইন্টারনাল সিস্টেমে ইনপুট দিয়েই ভদ্রলোক আপনাকে রেফার করতে পারবেন। তখন পুরুত করে আপনার কাছে ইমেই চলে আসবে যে জবার অমুক আপনাকে রেফার করেছেন। সেই লিঙ্ক ধরে আপনাকে এপ্লাই করতে হবে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কোম্পানীগুলো ইন্টারনাল রেফারালদের কে ইন্টারভিউ এর সুযোগ দিয়ে থাকে। কিন্তু ব্রাদার এই পর্যন্তই কিন্তু, পুলসিরাত কিন্তু আপনাকে প্রমাণ করেই পার হতে হবে। নিজের যোগ্যতায় ইন্টারভিতে হায়ারিং ম্যানেজারকে কনভিন্স করতে পারলে তবেই আপনি চাকুরী পাবেন। যে ভাই বা আপা আপনাকে রেফার করেছেন উনার কাজ কিন্তু শেষ, তিনি আর কোনো ভাবেই আপনাকে সহযোগীতা করতে পারবেন না।

হুম বুঝলাম, কিন্তু হেতে আমারে রেফার করবো কেন?

ট্যাকা আর ট্যাকা ভাই! আপ্নে যদি হাসাই চাকরি পেয়ে যান তাহলে আপ্নারে রেফার করার কারনে সেই ভদ্রলোক একটা ইন্সেন্টিভ পাবেন যা গড়পড়তা ৫০০ থেকে ২০০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে! কোনো কোনো কোম্পানীতে এই ইন্সেটিভটা বেশ লুক্রেটিভ!

সারছে, কানাডায় তো আমার কেউ পরিচিত নাই, তাইলে আমি কি শেষ?

ধুর মিয়া, আমি কি তাই কইসি!

 

টোটকা নাম্বার ২ঃ ইন্টারনাল রেফারালে পাশাপাশি প্রতিটি বড় কোম্পানী কোনোও না কোনো হায়ারিং এজেন্সির সাথে চুক্তি বদ্ধ থাকে। যেমন ধরুন আরবিসি এমন এক আদম খুজতেসে যে কিনা ফু দিলেই ক্রেডিট কার্ড বিক্রি হয়! ব্যাস, আরবিসি এজেন্সিকে বলে দিবে আমার আলাদিনের চেরাগ চাই তুই যেখান তে পাস খুইজ্জা নিয়া আয়। বলার সাথে সাথে, হায়ারিং এজেন্সি দূরবীন দিয়া তালাশ শুরু করবে। লিংকডিন, ইন্ডিড, মন্সটার, ওয়ার্কোপলিস ছাড়াও নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে আলাদিনের চেরাগ লিখে সার্চ দিবে। যে কয়টা চেরাগ পাওয়া যায় সেখান থেকে ফু দিয়ে ক্রেডিট কার্ড বেচতে পারে তেমন ১০টা (গড়ে) আদম খুজে বের করবে। কিন্তু ফু কি দিলেই হবে? কেউ কুতাই কুতাই দরবেশ বাবার মত ফু দেয় তো কেউ এক ফু তে পগারপার করার মতো ফু দেয়! তাহলে?

এবার হায়ারিং এজেন্সি একে একে এই দশ আদমকে ফোন দিবে। এটাও এক ধরনের স্ক্রিনিং ইন্টারভিউ। এদের সাথে কথা বলে যে কয়টারে সুইটেবল মনে হবে তাদের আলাদা করবে (ইয়ে মানে “বেল” যেমন চাচ্ছে তেমন প্রোফাইল)। গড়পড়তা ২-৫টা রঙ চং করে প্রোফ্রাইল বেলের হায়ারিং ম্যানেজারকে সাবমিট করবে। এবার বেলের হায়ারিং ম্যানেজারের স্ক্রিনিং, ভাই চাইলে সব প্রোফাইল রিসাইকেল বিনে ফেলে দিতে পারে অথাবা পছন্দ হলে ইন্টারভিউ নিতে পারে। আর যদি আপনি সিলেক্ট হয়েই যান তাহলে আপনার মাসিক মাইনের উপর ভিত্তি করে হায়ারিং এজেন্সি কমিশন পাবে।

 

এইবার বুচ্ছেন ব্যাপারটা?

কিন্তু ভাই আমি তো দুই টোটকার একটাও কাজে লাগাতে পারি নাই।

কথা সত্য, হতেই পারে। কিন্তু তখন?

আপাতত পাওয়ার ন্যাপ (রেস্ট) নেন, বাদ বাকি পরের পর্বে...

 

কানাডা মাইগ্রেশনের সুযোগ, প্রিপারেশন, প্রসেসিং । পর্ব ০১

পর্ব ০২ঃ কানাডায় সুযোগ সুবিধা?

পর্ব ০৪ঃ কানাডার লাইফ স্টাইল আর খরচাপাতি?