কিছু দিন আগে এক ভাই ইনবক্স করেছেন, ছদ্ম নামে উনার জিজ্ঞাসার খন্ডিতাংশ নিচে তুলে ধরলাম।

“ব্রাদার, আসসালামু আলাইকুম। পরসমাচার এই যে, গতকাল আমার মামা সুদূর কাতার থেকে দিবাগত রাত ৩টায় হন্তদন্ত হয়ে আমাকে ফোন দিয়েছেন! উনার সাথে আমার কানাডায় ওয়ার্কার ভিসা নিয়া যে বাতচিত হইয়াছে তা হুবুহু তুলে ধরলামঃ

“ক্রিং ক্রিং...

হ্যালো হ্যালো মোখলেস তুই কই?

কই মানে? এতো রাইতে আবার কই থাকুম মামু?

ওরে গাধা, কানাডায় লাইন ধরে ওয়ার্কার ভিসায় লোক নিচ্ছে, এক্ষুনি তালাস লাগা। কতটাকা আর কারে ধরতে হবে তাত্তারি জানা, ভিসা শেষ হয়ে গেলে আর পাবি না।”

 

মুহতারামে হাজিরিন, সুদীর্ঘকাল থেকেই রুটিরুজির আশায় বেঙ্গল থেকে মানুষ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। কেউ নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে তো কেউ দালাল ধরে আরব্য রজনীর আলো ঝিলমিল কাতার, দুবাই, সৌদি কিংবা হালের মালয়েশিয়ায়।

ভালো কথা, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করার সাথে সাথে কক্সবাজারের শ্রমজীবি মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় উঠে পরে লেগেছে। রোহিঙ্গারা নাকি যেকোনো পারিশ্রমিকে দিন মজুরের কাজ করে সংসার চালানোর জন্য হন্যে হলে শহরময় ঘুড়ে বেরাচ্ছে।

চিন্তার কথা!

পুরান পাগল ভাত পায় না, আবার নতুন পাগল এসে জুটেছে?

 

এখন কথা হলো কানাডা কেন আপনাকে ওয়ার্ক পারমিট দিবে? আর ওয়ার্ক পারমিট এর মাজেজাই বা কি?

আসেন কেইস স্টাডি করি। এই যে বাংলাদেশ থেকে এয়ার এশিয়া আর মালিন্দ ভরে ভরে ওয়ার্ক ভিসায় মালয়েশিয়া লোক যাচ্ছে তার রহস্য ঘাটতে মোল্লা নাসির উদ্দিনকে লাগবে না। খুব সহজ সরল ক্যালকুলেশন, অল্প টাকায় শ্রম! কাতার, দুবাই, কুয়েত, বাহরাইন আর মালয়েশিয়ার মত দেশেই প্রবাসী শ্রমিক (আনস্কিল্ড) বেশী! রেমিটেন্স বা বৈদেশীক মুদ্রার ইনফ্লো দেখলেই বুঝতে পারবেন এসব দেশ থেকেই বড় অংকের টাকা দেশে আসছে। কোনো দেশই তার নিজের টেনজিবল ফায়দা ছাড়া ওয়ার্ক পারমিট দেয় না। আবার উন্নত বিশ্বে আপনি চাইলেও কম টাকায় শ্রমিক খাটাতে পারবেন না। উলটা পালটা করছেন তো পরের দিনই আপনি গারদে!

কানাডার শতকরা ৭ শতাংশ মানুষ বেকার। সিম্পল পাটি গণিত কষলে দেখা যায় সে সংখ্যাটা প্রায় ২৫ লাখে গিয়ে ঠেকে! আশ্চর্য, যেখানে ২৫ লাখ মানুষ বেকার সেখানে অনুন্নত বিশ্ব থেকে ওয়ার্কিং ভিসায় লোক আনার প্রশ্নই উঠে না! তবে হ্যাঁ, কানাডা স্কিল্ড লোকজন নিচ্ছে কারণ এই মুল্লুকে স্কিল লোকের বড়ই অভাব। বিভিন্ন প্রভিন্স তাদের জব মার্কেট এনালাইস করে বিভিন্ন স্কিমের মাধ্যমে লোক নিচ্ছে যার একটা বড় অংশ ফেডারেল গভরমেন্টের এক্সপ্রেস এন্ট্রি পোগ্রামের মাধ্যমে প্রসেস হয় তো বাকিটা প্রভিন্সের নিজেদের প্রোগ্রাম দেখভাল করে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে আর এপ্লাই করার সুযোগ তারাই পাবেন যাদের আইইএলটিস এবং নূন্যতম এক বছরের কাজের অভিগ্যতা আছে।

 

 

তাহলে ওয়ার্ক ভিসা?

হুম, কানাডা সত্যিই ওয়ার্ক ভিসা দেয় তবে অংকটা বেশ জটিল!

প্রথমত চিন্তা করে দেখেন আমার আপনার মধ্যে এমন কি আছে যা কানাডার মানুষের মধ্যে নাই? কথা সত্যা! সহজ ভাষায়, কানাডিয়ান এমপ্লয়ার তখনি আপনাকে নেবার জন্য ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করবে যখন আতসী কাচ দিয়ে খুঁজে তার মন মত লোক কানাডায় খুজে পাবে না! কিন্তু সেটাই বা কেমনে সম্ভভ!

সম্ভব!

ধরুন,ধরুন কানাডার টরেন্টোতে সিলেটের সাতকরা রেসিপি দিয়ে নতুন এক রেস্টুরেন্ট খোলার কথা ভাবছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী! কিন্তু সিলেটের সাতকরা তৈরী করতে হবে এমন পাকা রাধুনী শুধু সিলেটের জল্লার পারের ১৩/বি বাসার কুদ্দুসই পারে। মোদ্দা কথা, কুদ্দুস ছাড়া এই রেস্টুরেন্ট চলবে না!

কুদ্দুসকে চাই ই চাই।

এবার কুদ্দুসকে রিক্রুট করতে হলে বেশ কিছু পেপার ওয়ার্ক এবং প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। প্রথমত রেস্টুরেন্টের মালিককে কানাডার সরকারী জব পোর্টাল জব ব্যাংকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। শুধু তাই না, পাশাপাশি আরো দুটি জব পোর্টালে চাকুরীর সারকুলার দিতে হবে। ভালো কথা, গাদা গাদা সিভি থেকে বাছাই করে মালিক পক্ষকে ইন্টারভিউ নিতে হবে। এই ইন্টারভিউর আবার প্রমাণ রাখতে হবে। মালিক পক্ষকে প্রমাণ করতে হবে ইন্টারভিউ নেবার পরও সাতকরা রান্না করতে পারে এমন লোক খুঁজে পাওয়া যায় নি! এবার মালিক, যথাযত কাগজপত্র নিয়ে লেবার মার্কেট ইমপেক্ট এসেসন্টের জন্য আবেদন করবেন। জুড়ী টিম যাচাই বাছাই করে দেখবে সত্যিই কি কানাডায় এমন কোনো আদম নাই যে সাতকরা বানাতে পারে আর রেস্টুরেন্টে কাজ করতে ইচ্ছুক!

 

এমনকি আপনি যে কুদ্দুসকে বেতন দিয়ে কানাডায় আনবেন সেই বেতন কানাডার পে স্কেলের সাথে সামঞ্জ্যশ্য কিনা সেটাও খুটিয়ে দেখা হবে। মালিক সত্যি সত্যি লোক খুঁজে পায় নাই না কুদ্দুস মালিকের ভায়রা ভাই সেটাও খুটিয়ে দেখা হবে। এরকম বেশ কিছু এলিমেন্ট চেক করার অথরিটি কনভিন্স হলে তখনি ওয়ার্ক পারমিটের অনুমতি দেয়া হয়! এই এসেমেন্ট আবার ফ্রি না, এর জন্য মালিক পক্ষকে টাকা গুণতে হবে! এখন কথা হলো, আদতে এই প্যার নিয়ে কোনো মালিক পক্ষ বাংলাদেশ থেকে লোক নিবে?

উত্তর না।

তবে হ্যাঁ, এই দেশেও সিস্টেম সম্ভব।

কিছু এজেন্সি আর এলেবেলে কোম্পানী মোটা অংকের টাকার বিনিময় এই কাজ করে থাকে। ব্যাপারটা অত্যন্ত জটিল আর সময় সাপেক্ষ।

 

 

তবে আশা করি যারা ভেবেছিলেন গুলশানের কানাডা এম্বেসী থেকে লাইন ধরে ভিসা পাওয়া যাচ্ছে তাদের ভুল ভেঙ্গেছে।

এই ফোরামের বেশীরভাগই স্কিল ক্যাটাগরীতে এপ্লাই করছেন।

এই পোস্ট আপনাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। যারা আমাকে ইনবক্স করেছিলেন, কানাডা ওয়ার্ক ভিসা কোথা থেকে পাবেন তাদের জন্যই আসল চিত্র তুলে ধরা!

 

কানাডা মাইগ্রেশনের সুযোগ, প্রিপারেশন, প্রসেসিং । পর্ব ০১

পর্ব ০২ঃ কানাডায় সুযোগ সুবিধা?

পর্ব ০৩ঃ কানাডায় চাকুরী সমাচার?

পর্ব ০৪ঃ কানাডার লাইফ স্টাইল আর খরচাপাতি?