আধুনিক ফ্যাশান ডিজাইনারদের কথা বলতে গেলে চোখ বন্ধ করে যে ক’টা নাম সবার আগে মাথায় চলে আসে, কোকো শ্যানেল তাদের মধ্যে অন্যতম। নারীদের পোশাকে খুবই সাধারণ কিছু ডিজাইনের ব্যবহারে অসাধারণ সব স্টাইল সৃষ্টি করে শ্যানেল ফ্যাশন জগতে মোটামুটি এক ধরণের বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। কোকো শ্যানেল একমাত্র নাম, যে নামটি ফ্যাশান ডিজাইনার হিসেবে বিখ্যাত টাইমস ম্যাগাজিনে “বিংশ শতকের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তি”র তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

 

শ্যানেলের প্রথম জীবনঃ

শ্যানেলের জন্মসাল সম্পর্কে সুনিশ্চিতভাবে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেকের মতে কোকো শ্যানেল ১৮৩৩ সালে একটি নিতান্তই সাধারণ গরীব ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। ১২ বছর বয়সে তাঁর মা মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা তাঁকে আর তাঁর দুই বোনকে করিয’এর একটি কনভেন্ট’এ পাঠিয়ে দেন। এ ধরণের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কঠোর অনুশাসনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে উঠতে কোকো শিখে ফেলেন যাবতীয় সেলাই কাজকর্ম।

১৮ বছর বয়সে তিনি কনভেন্ট ছেড়ে মোউলিনস’এ যান এবং একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে দর্জি হিসেবে কাজ শুরু করেন।

 

১৯২০ সালের দিকে মূলতঃ নারীদের ফ্যাশনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে শ্যানেলের ডিজাইন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়টা পর্যন্ত নারীদের পোশাকের মধ্যে গোড়ালি অবধি লম্বা স্কার্ট ছাড়া ভিন্ন কোন ডিজাইনের কথাই যেন কেউ ভাবতে পারতো না। এ ধরণের লম্বা জামা পরে কাজ করতে বেশ অসুবিধাই পোহাতে হতো অনেক সময়। ঠিক এরকম একটা সময়ে কোকো শ্যানেল ভাবলেন ভিন্ন কিছু। তিনি চাইলেন নারীদের পোশাকে আসবে বৈচিত্র, আসবে এমন কিছু ডিজাইন যা একইসাথে ফ্যাশনেবলও হবে, হবে কাজের জন্য আরামদায়ক আর সুবিধাজনক। যেই ভাবা সেই কাজ, লেগে পরলেন পোশাকের নতুন ডিজাইন তৈরির কাজে, যে পোশাক হবে একই সাথে রুচিশীল এবং স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক।

 

শ্যানেলের ভাষায়.তখনকার অবস্থা ফ্যাশান তো মোটামুটি একটা রসিকতা হয়ে গেছে বলা যায়। ডিজাইনাররা হয়তো ভুলেই গেছেন যে জামাটার ভেতরে একটা জলজ্যান্ত মেয়েও থাকে! বেশির ভাগ মেয়েরাই দেখি পোশাক বানায় মূলত ছেলেদের আকৃষ্ট করার জন্য এবং প্রত্যেকেই চায় কেউ তাদের প্রশংসা করুক। কিন্তু শুধু নজরকাড়া ডিজাইনের পোশাক পরলেই তো আর হলো না, জামাটা পরে তাকে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে তো পারতে হবে, গাড়িতে উঠতে গিয়ে আবার জামার সেলাই যেন খুলে না যায়! যে পোশাকটা পরছেন তা তো অবশ্যই স্বাভাবিক আকৃতির হতে হবে।’’

পোশাকের ডিজাইন ছাড়াও তিনি Chanel No.5 নামে যে সুগন্ধিটি বাজারে চালু করেছিলেন তা আজও শ্যানেলের ট্রেডমার্ক হয়ে আছে।

 

শুরুর দিকের কথাঃ

১৯১৩ সালে শ্যানেল তার প্রথম বুটিক শপ খোলেন ড্যয়ভিল’এ। এই দোকান খোলার জন্য প্রেমিক আর্থার তাঁকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেছিলেন। এই ব্যবসায়ে বেশ ভালই খ্যাতি পেয়ে যান তিনি, এবং তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে আরেকটি দোকান চালু করেন বিয়ারিত্‌য’এ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়টায় এই বুটিকটি সমাজের বিত্তশালীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল।
১৯১৯ সালের মধ্যে প্যারিসের ফ্যাশনের জন্য বিখ্যাত জায়গার প্রাণকেন্দ্র ৩১ র‍্যু ক্যামবনে শ্যানেল তার নিজের বুটিক খুলতে সক্ষম হন।

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মূলত তিনি মেয়েদের পোশাকের ফ্যাশনে পরিবর্তন আনার কথা জোরেশোরে ভাবতে শুরু করলেন। কর্সেট এর মত অস্বস্তিকর পোশাকের ফ্যাশন থেকে বেরিয়ে এসে মেয়েদের উৎসাহিত করলেন ক্যাজুয়াল, আরামদায়ক পোশাকের প্রতি।.

 

১৯৩৮ সালে শ্যানেল ফ্যাশন ব্যবসা থেকে অবসর নেন। পরবর্তী সময়গুলোতে তার মনে হলো ফ্রান্সের পোশাকের ফ্যাশন দিন দিন কেমন যেন পুরুষতান্ত্রিক হয়ে পড়ছে, যা তিনি কখনো হতে দিতে চাননি। এই অবস্থায়, ১৬ বছর পর তিনি আবার একই ব্যবসায় ফিরে আসেন।

যদিও তখনকার সমালোচকরা তাঁর যুদ্ধপরবর্তী পোশাকের ডিজাইন গুলো খুব একটা পছন্দ করেনি, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে ডিজাইনগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সমাজের ধনী এবং বিখ্যাত নারীরা আবারো শ্যানেলের ফ্যাশনকে সাদরে গ্রহণ করে নেন, আর এভাবেই শ্যানেল এই ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন।

তুমি যদি অন্যদের মাঝে অনন্য হতে চাও, তাহলে তোমাকে অবশ্যই ভিন্ন কিছু করে দেখাতে হবে।” ----কোকো শ্যানেল

 

ফ্যাশন জগতে শ্যানেল বেশ কিছু অভিনব আইডিয়া জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। দামী অলংকারের অনুকরণে নতুন এক ধরণের অলংকার তিনি বাজারে চালু করেছিলেন। ১৯২৯ সালে বিখ্যাত শ্যানেল ব্যাগ বাজারে আনেন। শ্যানেলের অন্যান্য সৃষ্টিগুলোর মতই এটাও একইসাথে ছিল দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি ছিল ব্যবহারে সুবিধাজনক আর ফ্যাশনেবল। ১৯৪৮ সালে এই ডিজাইনটি পরিবর্তন পরিবর্ধনের মাধ্যমেই বাজারে আসে বিখ্যাত  Chanel 2.55

 

ব্যক্তিজীবনে শ্যানেলঃ

ব্যক্তিগত জীবনে শ্যানেল কখনো বিয়ে করেননি, যদিও বিভিন্ন প্রভাবশালী পুরুষের সাথে বিভিন্ন সময়ে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কবি পিয়্যের রেভারদি এবং ডিজাইনার পল আইরিব। অনেক জীবনী লেখকই তাঁর ব্যাক্তিগত জীবনকে রহস্যময় বলে মন্তব্য করেছেন।

শ্যানেলের বৈচিত্র্যময় জীবনের গল্প নিয়ে ১৯৬০ সালে একটি সিনেমাও তৈরি হয় যাতে শ্যানেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ক্যাথরিন হেপবার্ন। ১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি ৮৭ বছর বয়সে হোটেল রিত্‌য এ কোকো শ্যানেল মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে এই হোটেলেই তিনি জীবনের ৩০টি বছর কাটিয়েছিলেন।

 

তথ্যসূত্র- বায়োগ্রাফি অনলাইন ডট নেট