ব্যাংক বলেন আর বিসিএস বলেন দুই জায়গাতেই মার্কসের বিশাল ব্যবধান তৈরি করে দেয় নিঃসন্দেহে ইংরেজি ও ম্যাথ। ইংরেজির ক্ষেত্রে বলা যায়, আপনার গর্ব করার মত স্টক অব ওয়ার্ড আছে - আপনি ৬০% মার্কস এমনিই পাবেন। ১০% এর মত পাবেন Literature থেকে। ২৫% পাবেন Vocabulary+Grammar থেকে।আর বাকি ৫% আপনার ভুল হবে বা পারবেন না। এই পার্সেন্টেজ নিয়ে মাথা গরম করার কিছুই নাই। এটা একটা ধারণামাত্র। ম্যাথের ক্ষেত্রে, আপনার যদি ব্যাসিক বুসিক নামে কোন পদার্থ না থাকে তাহলে মহান আল্লাহতায়ালার উপর ভরসা করে কপালের নামে আন্দাজে দাগিয়ে, এর ওর খাতা দেখে ৩০/৫০ এ ১০/১৫ পাবেন কিনা সন্দেহ আছে। তবে, হ্যাঁ । তবে যদি আপনার ব্যাসিক ব্যাংকের ভল্টরুমের মত স্ট্রং হয়, তাহলে ৩০ এ ৩০ আপনার জন্য ডালভাত- যদি ডালভাত পান্তা-ইলিশ না হয়ে থাকে। রিটেন ম্যাথও আপনি এক তুড়িতেই উতরে যাবেন।

ইদানীং গ্রুপে আমার পদচারণা একটু কম। এই অবসরে আমার ইনবক্সে যে পরিমান মেসেজ এসেছে তার সংখ্যাও গর্ব করার মত।আমি কাজের ফাঁকে ফাঁকে প্রায় সবগুলো মেসেজই পড়েছি। অর্ধেকের বেশি মেসেজের যে ভাষ্য তা নিজের ভাষায় বলি,

‘ভাইয়া/স্যার, আপনি তো ওভারঅল প্রিপারেশন(ব্যাংক ও বিসিএস) নিয়ে অনেক গলাবাজি ও ভ্যাজর ভ্যাজর করেছেন, একটু সাবজেক্ট ওয়াইজ ভ্যাজর ভ্যাজর, বিশেষ করে, ম্যাথ নিয়ে হলে, ভাল হয়।’
এক কথায় উত্তর দেয়া যায়, ‘ভাই, আমি ইংরেজির ছাত্র। নিজের জায়গা ছেড়ে নড়ব না।’


কিন্তু, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো যার স্বভাব, তার তো কথা বলতেই হবে। তো শুরু করি-

ম্যাথ পারি না। কারণ,
১। ম্যাথের প্রশ্নগুলো ইরেজিতে থাকে। ইরেজিতে দুববল(দুর্বল), তাই যুক্তিবিদ্যার সুত্রানুসারে ম্যাথকে মাফ করিনি;
২। প্রশ্ন বুঝলেও কোথা থেকে শুরু করব- বুঝতে বুঝতে ঘণ্টা পড়ে যায়;
৩। ব্যাসিক নড়বড়ে;
৪। আপনার ব্যাসিক একদিনে নড়বড়ে হয়নি। দীর্ঘ ১৫/১৬ বছর ধরে দাদাভাই-দিদিভাই, এটা আপনি তৈরি করেছেন। বিশ্বাস না হলে, বিশেষ করে, সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত ম্যাথ ক্লাসের সময়কালকে মনের ডিজিটাল পর্দায় একটু দেখে নিন। কী করে রেখে এসেছেন, বুঝতে পারবেন।

এই সুযোগে একটু ঢোল পিটিয়ে যাই- মালটা আমি আর্টসের। সেই ক্লাস ফোরে একবার ১০০ তে ৪০ পেয়েছিলাম। রেক্সোনা ম্যাডাম যে কী মাইরটাই না দিয়েছিল। কাঁচা কঞ্চির(বাশের ছেলে-পেলে) প্যাদানি। পরের বার ১০০। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ইন্টার পর্যন্ত দুই ম্যাথেই ৯০ আপ। ২০১০ সালে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরীক্ষায় আমার পাশের সিটে থাকা ছেলেটি যতক্ষণ ধরে ক্যালকুলেটরে টিপাটিপি করেছে, ততক্ষণে আমার ম্যাথ শেষ। খাতা জমা দিয়ে সবার আগে হল থেকে বেড়িয়েছি। ধরা খাইছি ৩৫ বিসিএস রিটেন ম্যাথে। কোন প্রাকটিস করিনি। ভাব ছিল এই যে, পারিই তো। এই ‘পারিই তো’
আমাকে রিটেন ম্যাথে শুইয়ে দিয়েছে।নিঃশ্বাসটা একটু ছিল। সেটা সাধারণ বিজ্ঞান ‘ইন্না লিল্লাহ...’ করে দিয়েছে।


যা হোক, সমস্যা যেহেতু করেই ফেলেছেন, সমস্যাকে পুষে না রেখে সমাধানের দিকে যাই-

আজ এখন থেকেই তোতাপাখির মত-
১। ১ থেকে ২৫ পর্যন্ত নামতা;
২। ১ থেকে ২০ পর্যন্ত সংখ্যার বর্গ;
৩। ১ থেকে ১৫ পর্যন্ত সংখ্যার বর্গমূল(দশমিকের পর তিন ঘর পর্যন্ত);
৪। ১ থেকে ১৫ পর্যন্ত সংখ্যার ঘন(দশমিকের পর তিন ঘর পর্যন্ত);
৫। এই টাইপের প্রয়োজনীয় সূত্রগুলো মুখস্ত করে ফেলুন।

আপনার ব্যাসিকের ব্যাসিক তৈরি হল।
রোগ যেহেতু দীর্ঘ ১৫/১৬ বছরের, একদিনে বা একমাসে সম্পূর্ণটা আপনি কাভার করতে পারবেন না। তাই সময় নিয়ে স্টেপ বাই স্টেপ-
১। সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত ম্যাথ বইগুলো কালেক্ট করে ফেলুন;
২। বইগুলোকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলুন যে, ‘বাবারা, তোদেরকে অনেক অবহেলা করেছি, ভুল বুঝতে পেরেছি। মাফ করে দিস্’;
৩। এক একটা বইয়ে যে সূত্রগুলো সারা বই দাপিয়ে বেড়িয়েছে, তা নিজে নিজে প্রমাণ করার চেষ্টা করুন। না পারলে সমাধান দেখুন বা কারও হেল্প নিন।
(a+b)^2 থেকে শুরু করে x= {-b± √(b^2-4ac)}/2a এর সমাধান প্রক্রিয়া, অনুসিদ্ধান্ত নিজে নিজে ট্রাই করুন;
৪। সহজ ম্যাথ দিয়ে শুরু করেন। সাহস পাবেন;
৫। ম্যাথে ব্যবহৃত ইংরেজিগুলো বিশেষ করে জ্যামিতির ক্ষেত্রে যে খটমট নামগুলো আছে তা মুখস্ত করে ফেলুন;
৬। বাংলায় না করে ইরেজিতে করার এবং এর আগে বোঝার চেষ্টা করুন;
৭। শয়নে স্বপনে ম্যাথ নিয়ে ভাবুন। প্রেমিকা থাকলে তাকে বলুন, ‘তোমাকে আমি π এর মানের দশমিকের পর দুইশ ঘর পর্যন্ত ভালবাসি। তুমি আমার Centre। তোমার অভিভাবককে Radius মেনে নিয়ে সেই দুরত্বে আমি Circumferance আঁকি। যখন তোমার বাবা আর কাকা মিলে Diameter হয়, অথবা Radian কোণে ঘিরে ফেলে, সেই চাপের উপর Circumferance তে তোমার কোণের অর্ধেক কোণ উৎপন্ন করি।’ এভাবে, ঠিক এভাবে নয়, বরং আপনি যেভাবে ভাবছেন, ঠিক সেভাবেই ম্যাথ নিয়ে খেলা করুন। ম্যাথ বাঘ না যে আপনাকে খেয়ে ফেলবে;
৮। নির্দিষ্ট ম্যাথটি পড়ে কল্পনায়, সম্ভব না হলে খাতায় Diagram বা Table এঁকে ফেলুন। এতে ম্যাথ এবং মাথা দুটোই পরিষ্কার হয়ে যাবে;
৯। বেশিরভাগ ম্যাথের ক্ষেত্রেই সমস্যাটাকে সমীকরণে রূপান্তর করে ফেললেই দ্রুত সমাধানে পৌছে যাওয়া যায়। এটাও মাথায় রাখুন;
১০। প্রাকটিসের সময় ক্যালকুলেটর ব্যবহার করবেন না;
১১। যারা ম্যাথে অত্যধিক দুর্বল, তারা কোন স্টেপ বাদ দিয়ে I mean and repeat শর্ট-কাটে ম্যাথ করবেন না;
১২। আপনাকে মহামান্য রামানুজন হতে হবে না। হতে হবে না পিথাগোরাস। Above Average হলেই দৌড়ুবে;
১৩। দশ কথার এক কথা, ম্যাথের জন্য প্রাকটিসের বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। যেদিন হবে সেদিন থেকে আর ম্যাথের কোন পরীক্ষাই কোন কর্তৃপক্ষ নিবে না। গ্যারান্টি;
১৪। প্রাকটিস করতে থাকুন সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৮ পর্যন্ত। ৩০এর পরে গবেষণা ছাড়া এটা আর কোন কাজ দেবে না।


আপনি একটা বিষয়ে সফল হয়েছেন- সেটাতে আর সফল হওয়ার কিছুই নেই। কিন্তু যেটাতে আপনি বিফল হয়েছেন, সেটাতে আপনার সফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পারবেন কি-না, সেটা নির্ভর করে আপনার নিজের উপর। আমার প্যাচাল শেষ। খোদা হাফেজ।

সনাতন দা’র ম্যাথ ক্লাস থেকে