২৩ অগাস্ট ১৯৪২ থেকে ২ ফেব্রুয়ারী ১৯৪৩  এই পাচ মাস অক্ষশক্তির সেনারা রাশিয়ার এই সর্ববৃহৎ শহরটিকে দখল করে রেখেছিল। নৃশংস - ভয়াল এই যুদ্ধে ব্যাপক বোমা হামলার দরুন সুনসান শহরটি ভাঙা ইট-পাথরের স্তুপে পরিণত হয়েছিল। এই ইস্টার্ন ফ্রন্টের যুদ্ধটি গোটা বিশ্বযুদ্ধের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ  টার্নিং পয়েন্ট ছিল। 

 

এই যুদ্ধটি সংগঠনের পিছনে অনেক কৌশলগত কারণ ছিল।  প্রথম কারণটি হচ্ছে এই শহরের অত্যাধিক শিল্প সক্ষমতা।  অক্ষশক্তি চাইছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে শহরের অসাধারণ এই সুবিধা থেকে বিরত রাখা কিংবা ভোগ করতে না দেয়া। দ্বিতীয়ত ভলগা নদী কাটা কেননা এই ভলগা নদী দিয়েই রাশিয়ার মুল ভুখন্ডে সকল বাণিজ্যিক লেনদেন হতো।  আরো বিশদ উদ্দেশ্য ছিল যেন উত্তর -পশ্চিমাঞ্চল এর সেনারা নিরাপদে বাকুতে পৌছাতে পারে। 

 

এই শহরটি রাশিয়ার একজন বিখ্যাত নেতার নামে হওয়ায় উভয় পক্ষের উপরই এটি প্রভাব ফেলে। কেননা প্রথমদিকে জার্মানদের ডমিনেন্সি থাকায় এটি নাতসি বাহিনীর জন্য ছিল শৌর্যের ঠিক উল্টো দিকে রাশিয়ানদের জন্য ছিল চরম হতাশার!

 

লুফতাওফ( নাতসি বাহিনীর এয়ার ফোর্স) যখন রাশিয়ান এয়ারফোর্সকে হারিয়ে সেখানে হামলা শুরু করলো তা ছিল সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক!  ৪৮ ঘন্টায় ১০০০ টন বিভিন্ন রকমের স্ট্র‍্যাটেজিক বোমা নিক্ষেপের দরুন পুরো শহর অগ্নিকুন্ডে পরিণত হয়। সকল অবকাঠামো জ্বলে-পুড়ে ছাড়খার হয়ে যায়। ফেরিতে বোমা ফেলা হয় যেন কেউ শহরের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে না পারে এবং কেউ প্রবেশ করতে না পারে। 

 

স্টালিনগ্রাডে সোভিয়েত সেনা এবং জনগণ উভয়ে মিলে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। সিভিলিয়ানরা মূলত প্রতিরক্ষা ব্যুহ নির্মাণ করতেন। অনেককে অস্ত্র ছাড়াই যুদ্ধে পাঠানো হত। অসম্পূর্ণ ট্যাংকের অংশগুলি কারখানা থেকে সামনে লাইন পর্যন্ত আনা হয়েছিল, যেখানে বন্দুক হাতে হাত দ্বারা দেখানো হয়েছিল। যুদ্ধের ভয়াবহতায় অনেক সময় ভীত সোভিয়েত সেনারা পালানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু তাদের কমান্ডাররা তাদের পালাতে দিত না। কেউ পালাতে চাইলে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হত।

 

the telegraphthe telegraph

 

জার্মান সেনারা রণকৌশল আর লং রেঞ্জের ফায়ারপাওয়ারে রাশিয়ানদের থেকে এগিয়ে ছিল। রাশিয়ানরা তাই তাদের সাথে কম দূরত্বে অবস্থান নিত আর টিকে থাকার জন্য আপ্রাণ যুদ্ধ করত। উন্নত আক্রমণ সক্ষতা স্তত্বেও নাৎসী বাহিনী কোন কোন জায়গায় তাদের অধিপত্য রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল যদিও ধীরে ধীরে তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল।

 

তিন মাসের প্রচন্ড যুদ্ধের পর জার্মানরা ভলগা নদীর তীর অবধি পৌছে যায়। সোভিয়েতদের নিয়ন্ত্রণে তখন স্টালিনগ্রাডের কেবল ১০%  অংশ দখলে ছিল। দিনে দিনে মৃতের সংখ্যা বাড়ছিল। যুদ্ধের স্ট্রেস আর বিশ্রামহীনতার দরুনজার্মান জেলারেল মায়োকাইমিয়া( অনিয়ন্ত্রিতভাবে চোখের পাতা কুচকানো) রোগে আক্রান্ত হন। এদিকে সোভিয়েত সেনা কর্মকর্তা চুইকভও এক্সিমায় আক্রান্ত হন। যার ফলে হাতে ব্যান্ডেজ দিয়ে রাখা লাগত সব সময়।

 

সোভিয়েত রা নাৎসী থেকে অপেক্ষাকৃত কম শক্তির হলেও তারাও জার্মান দের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছোট ছোট কাউন্টার এটাক করতে থাকে। ১৯ নভেম্বর তারা নাৎসীদের বিরুদ্ধে অপারেশন 'ইউরেনাস' পরিচালনা করে এবং ছোট খাটো সাফল্য পাওয়া শুরু করে। মোটামুটি পুরো শহর হিটলারের বাহিনীর আয়ত্তে  থাকলেও শহরের উত্তর ও দক্ষিণের কিছু অংশ সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে ছিল। জার্মানদের  সাথে রোমানিয়া আর হাংগেরীর সেনাদলও ছিল। কিন্তু নাৎসীরা কেবল আগ্রাসনের দিকেই মনোযোগী ছিল পালটা আক্রমণ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। যার ফলে ১৯ নভেম্বরে সোভিয়েত আক্রমণে জার্মান অধীনে থাকা রোমানিয়ান সেনাদল ব্যাপক মার খায় এবং যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যায়। রাশিয়ার প্রচন্ড তুষারপাতও নাৎসীদের জন্য ব্যাপক প্রতিকূলতা সৃষ্টি করে।

 

war on the rockwar on the rock

 

২৩ নভেম্বর নাৎসীসেনা কালাচে(স্টালিনগ্রাডের পশ্চিমের একটি অঞ্চল) সোভিয়েতদের মুখোমুখি হয় আর সেখান সোভিয়েতরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তাদের সেই মুহুর্থে পিছু হটা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু হিটলার তাদের পিছু হটতে নিষেধ করেন। কারণ তিনি সেপ্টেম্বর মাসেই জনসভায় ঘোষণা দেন যে নাৎসীরা স্টালিনগ্রাড থেকে পিছু হটবে না। তিনি নির্দেশ দেন যে আটকে পড়া সেনারা যেন যুদ্ধ চালিয়ে যায়। তাদেরকে লুফতাফের মাধ্যমে রসদ প্রেরণ করা হবে এবং নতুন করে আক্রমণ করে অবরুদ্ধ সেনাদের মুক্ত করা হবে।

 

কিন্তু তার সিদ্ধান্তে আটকে পড়া ২৬৫০০০ অক্ষ সেনার (যাদের বেশিরভাগই জার্মান সিক্সথ আর্মির সদস্য) ভাগ্যের পরিবর্তন আনতে পারে নি। তাদের মুক্ত করার জন্য পরিচালিত অভিযান ব্যর্থ হয়। সে অভিযানের মধ্যে সবচেয়ে সফল সেনা নায়ক জেনারেল ম্যান্সটেম। যিনি ১৯ ডিসেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাপক রণকৌশল এর মাধ্যমে আটকে পড়া সেনাদের ৩০ মাইল কাছাকাছি চলে আসেন। কিন্ত শেষমেষ পরাজিত হন। লুফতাফ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও পর্যাপ্ত রসদ পাঠাতে ব্যর্থ হয়। খাদ্য আর গুলির অভাবে দিন দিন দুর্বল হতে থাকে অক্ষসেনা।

আটকে পড়া অক্ষ সেনারা দুটো কমান্ডে বিভক্ত ছিল। সাউদার্ন গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন জেনারেল পাওলুস আর নরদার্ণ গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন জেনারেল স্ট্রেকার।

 

হিটলার চাইছিলেন তার জেনারেলরা যেন আত্মসমর্পণ এর পরিবর্তে আত্মহত্যা করেন। তিনি সেই জন্য পাওলুসের করা আত্মসমর্পণ এর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। উলটো পাওলুসকে ৩১ জানুয়ারি পদোন্নতি দিয়ে 'ফিল্ড মার্শাল ' উপাধি দেন। তাতেও কাজ হয়নি। পাওলুস অইদিনই তার অধিনস্ত সেনাদের নিয়ে সোভিয়েতদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তিনিই প্রথম কোন ফিল্ড মার্শাল যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সারেন্ডার করেছিলেন। ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ বিকাল ৪ টায় জেনারেল স্ট্রেকারও তার অধিনস্ত সেনাদের নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

 

এভাবেই অনেক রক্ত-যুদ্ধ-আত্মসমর্পণ এর মাধ্যমে নাৎসী মুক্ত হয় স্টালিনগ্রাড!