প্রথমেই বলে রাখছি, যুদ্ধ কখনোই কাম্য না। আমরা কখনোই চাই না যে যুদ্ধ বাঁধুক।  আপাত দৃষ্টিতে বাংলাদেশের থেকে বার্মা সমরাস্ত্রে বেশি শক্তিশালি। যুদ্ধ কখনো বাধবেনা। কিন্তু যদি বাধে তবে সেই পরিস্থিতিটা কেমন হতে পারে সেটা বিশ্লেষন করা দরকার। শুরুতেই কিছু প্রশ্ন রাখছি। প্রশ্নের উত্তরগুলি আলোচনার মাধ্যমে খুজবার চেষ্টা থাকবে।

 

প্রথমেই যেই প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে সেটা হল যুদ্ধ যদি বাধে তবে সেটা কি নিয়ে বাধবে? অর্থাৎ কি কি বিষয় নিয়ে বাধতে পারে?

যুদ্ধে বার্মা এবং বাংলাদেশ কাদের সমর্থন পেতে পারে? কে কোন পক্ষ নিতে পারে?

যুদ্ধটা ঠিক কি কি ভাবে বা কৌশলে হতে পারে? স্থায়িত্ব কেমন হতে পারে?

যুদ্ধের ফলে কার কি কি ক্ষতি বা লাভ হতে পারে?

এছাড়া আরো কিছু ছোট প্রশ্ন এবং উত্তর নিয়ে বিশ্লেষণ করব।

 

বাংলাদেশ বার্মা দুটি প্রতিবেশি দেশ। প্রতিবেশি বলা হলেও সারা বিশ্বে বার্মা উত্তর কোরিয়া ঘরনার বিচ্ছিন্ন দেশ হিসাবেই পরিচিত। দীর্ঘকাল সামরিক শাষন, নিজ দেশের জনগণের উপর অত্যাচার নিপীড়ন, বিশ্ব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা, জাতিসংঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে তোয়াক্কা না করে চলা, সর্বপরি দেশ হিসাবে কূটনৈতিক শিষ্ঠাচার বর্জিত দেশ হিসাবে তাদের পরিচিতি দীর্ঘদিনের। সামরিক শাষনের আমলে দীর্ঘকাল আমেরিকা ইউরোপের অবরোধের কবলে ছিল দেশটি। নামমাত্র গণতন্ত্র ফিরে আসবার পর অবরোধ শিথিল এবং কিছু ক্ষেত্রে উঠিয়ে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের থেকে কয়েকগুন বড় দেশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের জিডিপি মাত্র $৬৮ বিলিয়ন।

 

যেসব ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ বার্মা যুদ্ধ হতে পারে তার মধ্যে প্রধান কারণ হল বার্মা দীর্ঘকাল সামরিক শাষনে থাকার কারনে কূটনীতিক শিষ্টাচার থোড়াই কেয়ার করে। বলা যায় তারা উত্তর কোরিয়ার মতই অনিশ্চিত একটা দেশ। কখন কি করে বসবে সেটার নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন।

 

বাংলাদেশ বার্মার বিরোধের মূল দুটি ইস্যু হল রোহিঙ্গা সমস্যা এবং সমুদ্র বিরোধ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বার্মার চলমান উস্কানি সীমিত যুদ্ধে রূপ নেবে না সেটার নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন। সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আদালত এর রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে যেহেতু এটা বার্মা, তাই পরিস্থিতি কখন কোন দিকে মোড় নেয় বলা কষ্ট। ধরুন দুই দেশের সমুদ্রসীমা রেখা বরাবর পানির নীচে বিশাল তেল গ্যাসের খনি আবিষ্কৃত হল। এরকম পরিস্থিতিতে বার্মা যে আদালতের রায় অমাণ্য করবে না সেটার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। কারন অতিতেও তারা নিজেদের দেশেও আইন কানুন উল্টিয়ে দেবার ইতিহাস রয়েছে। নিজ দেশেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে আবার কেড়ে নেবার ইতিহাস আছে।

উপরুক্ত কারণগুলি শুধু কল্পনার খাতিরে। এরকম হবার সম্ভাবণা খুব কম। এরপরো আমরা আলোচনার সুবিধার্থে এই বিষয়ে কিঞ্চিত বলেছি।

 

এবার আসি দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে। যদি যুদ্ধ হয় তবে সেক্ষেত্রে কোন দেশ কার সমর্থন পেতে পারে?

বার্মার সামরিক জান্তা অর্ধশতাব্দি ক্ষমতায় টিকে আছে মুলত দুটি দেশের সমর্থনের কারনে। চীন এবং রাশিয়া। এই দুটি দেশই কিন্তু উত্তর কোরিয়াকেও প্রশ্রয় দিয়ে আসতেছে। কোল্ড ওয়ারের সময় ও এসব দেশ যাতে করে মার্কিন প্রভাব মুক্ত থাকে তার জন্য একপ্রকার এক তরফা সমর্থন পেয়ে যাচ্ছে বার্মা ও উত্তর কোরিয়া।

কিন্তু মজার বিষয় এই দুইটি দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক মোটেও খারাপ নয়। চীন বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। এদেশে চীনের বিনিয়োগ বার্মা থেকেও বেশি। ইতিমধ্যে দুইটি দেশ $২৪ বিলিয়নের ঋনচুক্তি সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে চীন যুক্ত আছে। অর্থাৎ চীনের স্বার্থ বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেই বেশি বার্মার তুলনায়।

 

এরি ধারাবাহিতায় বাংলাদেশ চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসাবে নাম লিখিয়েছে বার্মাকে পেছনে ফেলে। আগে যদিও পরিস্থিতি এমন ছিল না। তবে বিগত কয়েক বছরে চীন বাংলাদেশ সম্পর্ক স্ট্রাটেজিক পর্যায়ে কিছুটা হলেও গিয়েছে।

অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের স্বাধীনতায় সরাসরি অবদান রেখেছে। যদিও পরবর্তিতে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কে উষ্ণতার অভাব দেখা গেছে সামরিক শাষনের আমলে। তারপরো দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে সম্প্রতি সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। $১২ বিলিয়ন ডলারের রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এর প্রমাণ। সাবের হোসেন চৌধুরিকে তারা তাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাবে ভূষিত করেছে। এদেশ থেকে স্কলারশিপ দেবার সুযোগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরে সম্পর্ক আগের থেকে অনেক গভীর হয়েছে।

 

প্রশ্ন আসতে পারে তবে কেন তারা বার্মাকে সমর্থন দিল রোহিঙ্গা ইস্যুতে? আমার ব্যাক্তিগত মত হচ্ছে, সমর্থন না দেওয়াটা অবাক করা ব্যাপার ছিল। কারন এই বার্মাকেই তারা অর্ধশতাব্দি যাবৎ প্রশ্রয় দিয়ে আসতেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও চীন রাশিয়ার বর্তমান অবস্থান নতুন কিছু না। তাদের বিদেশনীতিতে তারা এটা কয়েক যুগ ধরেই করে আসতেছে। হটাৎ তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করে ফেলবে সেটা ভাবা বোকামি। সাথে আমেরিকা যে নীতি নেয় তার বিপরীত নীতি রাশিয়ার নেবার ইতিহাস নতুন না। ১৯৭১ সালেও আমরা সেটা দেখেছি। এর সাথে যুক্ত আছে স্বার্থ। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ হবার কারনে চীন বা রাশিয়াকে কোন কাজ চাইলেই বাছ বিচার না করে দিয়ে দিতে পারে না। সরকারি নিয়মনীতি মেনে দিতে হয়। কিন্তু বার্মার ক্ষেত্রে দেশ দুটিকে এরকম কোন পরিস্থিতির ভেতর পড়তে হয় না। তাই রাখাইনে গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজ চীন পেয়ে গেছে। এই প্রকল্পে মুনাফা ভাগাভাগি নিয়ে চীন বার্মাকে ১৫% দিতে রাজি হয়েছিল। পরে অবশ্য দরকষাকষি করে সেটা ৭০-৩০ তে গিয়ে ঠেকে। পাকিস্তানের গোয়াধর বন্দরে চীন মুনাফার ৯১% নিয়ে যাবে। ঠিক এইরকম বৈষম্য বাংলাদেশ কখনো মেনে নিবে না। আবার বার্মা খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। তাই মাইনিং এর কাজ চীন অনেক সহজ ভাবে বাগিয়ে নিয়ে বেশি মুনাফা করতেও সক্ষম। হয়ত এর বিপরীতে চীন কোন অস্ত্র বিক্রি করবে তাদের কাছে। এরকম কোন সুবিধা বাংলাদেশ দিতে সক্ষম নয়।

 

তাই যদি যুদ্ধ বাধে তবে বলা যায় চীন বা রাশিয়া কোন পক্ষকেই পূর্ণ সমর্থন না দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করার আহবান জানাবে। এর ফাকে দুই দেশের কাছেই অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখার সম্ভাবণা খুব বেশি।

পাকিস্তান নিজের কোন ভূমিকায় যাবে না। চীন যেটা করবে তারাও সেটা করবে। আর ভারত তার প্রতিবেশিদের সাথে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে চুড়ান্তভাবে ব্যার্থ। তারা চীনের প্রভাবের ভয়ে বার্মাকে হাতছাড়া করতে চাইবে না। এদিকে বাংলাদেশের পক্ষে বা বিপক্ষেও যেতে পারবে না। তাই তারা নিরপেক্ষ দর্শকের ভূমিকা নিবে। আর আহবান করবে যুদ্ধ বন্ধ হোক।

 

অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতিসংঘ, ওআইসি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে শুরু করে আমেরিকা বা কানাডার সমর্থন পাবার সম্ভাবণা বেশি থাকবে। কিন্তু তাদের সমর্থন খুব বড় কোন ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। তবে অবরোধ আরোপ হতে পারে বার্মার উপর। সব দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন যে খুব কম সেটা বলার অবকাশ নেই।


আপাতত প্রথম দুটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে প্রথম পর্ব শেষ করছি। পরের পর্বে শেষ দুটি প্রশ্নের বিশ্লেষন দেয়া হবে।

 

বাংলাদেশ বনাম মায়ানমার যুদ্ধ প্রস্তুতিতে কে সঠিক পথে?

মিগ ২৯ কেনার সেই সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশের সমুদ্রে অবরোধঃ সম্ভাবনা ও প্রস্তুতি।