সুদীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী তাদের নিজস্ব স্থানীয় বাহিনীর ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করে। তাদের সাধারণত নেভাল কমান্ডো বলেই অবহিত করা হয়। একটি সাধারণ বাহিনীকে বিশেষ করে দ্রুত গতির নেভাল বোট যা রাবার বোট সিআরআরসি নামে পরিচিত তা দিয়ে নিয়মিত টহন, বন্দী জেলে উদ্ধার, প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার মত সাহস অর্জন করানো হয়। ঘুমন্ত সোয়াডসকে যদি কেও জাগিয়ে তুলার উদ্যোগ নেন এবং বাস্তবেই কেও যদি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য হন তবে তিনি হলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাব্লিউ মাজিনা।

 

২০০৮ সালে তিনি বাংলাদেশ নেভাল উইং পরিদর্শন করেন। সেখানে নেভাল কমান্ডোদের ক্ষিপ্ত শার্দূলের ন্যায় আক্রমণ এবং হাঙ্গরের মত রক্ত স্বাদ দেখে অবাক হয়ে যান। যার ফলে তিনি সরাসরি প্রস্তাব করেন, আমেরিকান নেভি সিলের আদলে সোয়াডস তৈরি করা সম্ভব। অতঃপর আমেরিকান দক্ষ মাঠ কাঁপানো প্রশিক্ষক আনার চেষ্টা শুরু করেন। এই ড্যান মাজিনার একটু খোঁচাই জাগিয়ে দিল ধুমন্ত অপার সম্ভাবনাময় জলজ শার্দূলদের। এর পরই দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হল। সেই প্রস্তাব উপযুক্ত সন্মানে সাথে গ্রহন করলো দক্ষিণ কোরিয়া। আমাদের দেশেই নির্বাচন করা হল অজ্ঞাত সংখ্যাক সদস্যের একটি দলক। তাঁরাই মুলত ছিলেন সোয়াডস এর প্রথম সারির কমান্ডো। তারা দক্ষিণ কোরিয়া গেলেন এবং সাফল্যের সাথে কঠিন প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করলেন। এরপর আবারও সেই ড্যান ডাব্লিউ মাজিনা। তিনি আবার ২০০৯ সালে নেভাল উইং পরিদর্শন করেন। ১৫০ জন বাছাই করা নেভাল শার্দূল এবং ২০০ জন ডুবুরি সহ চট্টগ্রামে কাপ্তাইয়ে আমেরিকান মেরিন কোর্পসের ট্রেনার, দক্ষিণ কোরিয়ান ট্রেনার এবং বাংলাদেশী ট্রেনারদের নিয়ে শুরু হয় নতুন যাত্রা। এভাবেই ড্যান মাজিনার হাত ধরে সেই ১৫০ জন কমান্ডো আর ২০০ জন ডুবুরির দলের সংখ্যা বর্তমানে সহস্রাধিক।  

 

 

আমাদের নেভাল কমান্ডোদের যাত্রা বলা চলে ১৯৭০ সালেই শুরু হয়। ১৯৭০ সালে আমেরিকা পাকিস্থান নৌবাহিনীতে আধুনিকায়নের জন্য একটি বিশেষায়িত ব্রিগেড গঠন করা হয়েছিলো যার সদস্যদের সরাসরি দক্ষিণ কোরিয়া এবং আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। তারা তৎকালীন ১৯৭০ সালে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য জার্মানে যান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে, এই ব্রিগেডের প্রশিক্ষিত কমান্ডোরা পালিয়ে আসেন। তাঁদের মাধ্যমেই শেষ হয় অত্যন্ত সফল অপারেশন জ্যাকপট। এখানে তারা যে মাইন ব্যবহার করেছিলেন তা আমেরিকা এবং জাপানের তৈরী ছিল। আর এখন বিবর্তনের ধারায় সেই কমান্ডোরা পরিণত হয়েছেন দক্ষ চৌকস সোয়াডসে। . সোয়াডসে যোগদানের বাছাই পর্ব বেশ জটিল। প্রথমে উচ্চ পর্যায়ের বিশেষ বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চৌকস সদস্যদের সোয়াডসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।

 

বিশেষ এই টিমের প্রশিক্ষণ ও ব্যবহার্য অস্ত্রের তালিকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভি সীল এর আলোকে নির্ধারিত হয়েছে। সোয়াডস সাধারণত চোরাচালান দমন, সন্ত্রাস দমন, মাদক্দ্রব্য দমন, গোপন অনুপ্রবেশ, উদ্ধারকার্য, শত্রু অবস্থান ধ্বংস, ঝটিকা অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। বাছাইয়ের পর সোয়াডস সদস্যবৃন্দ উচ্চ মাত্রার শারীরিক, মনস্তাত্বিক ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকেন। এই বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সমপর্যায়ের সামরিক আয়োজনের আলোকে নির্ধারণ করা হয়। প্রশিক্ষকগণ নিজেরা যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্ক থেকে বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ ত। সোয়াডসের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া ও প্রশিক্ষকগণ কার্যক্ষেত্রে নির্মমতা ও ত্রুটির ব্যাপারে অনমনীয়তা প্রদর্শনের জন্য কুখ্যাত। এই বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণের কঠোরতা নিয়ে অনেক গল্প মজুদ আছে। এই বাহিনীর সবচেয়ে হার্ড এবং চ্যালেন্জিং নেভাল কমান্ডো ব্যসিক কোর্স হচ্ছে Hell Week (নরক সপ্তাহ)।  

 

জেনে নেওয়া যাক সোয়াডসের কোর্স সম্পর্কে: SWADS কে (১) Special Warfare এবং (২) Diving and Salvage এ দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। (১) Special Warfare গ্রুপকেই Naval Commando Group বলা হয়। Special Warfare তথা Naval Commando Group এর কাজ হল যুদ্ধকালীন সময়ে বিভিন্ন ধরনের স্পেশাল অপারেশন পরিচালনা করা। (২) Diving and Salvage Wing এর কাজ হল ডুবুরী ও উদ্ধারকার্য পরিচালনা করা। এখানে উল্লেখ্য যে সকল Special Warfare এর সদস্য তথা Naval Commando হল ডুবুরী। কিন্তু সকল ডুবুরী Commando না। Naval Commando দেরকে বলা হয় Combat Diver আর Diving and Salvage এর সদস্যদের বলা হয় Clearance Diver। তবে শান্তিকালীন সময়ে Naval Commando রা Clearance Diver হিসেবে বিভিন্ন উদ্ধারকার্যে অংশগ্রহন করে থাকে। আর যুদ্ধকালীন সময়ে তাদের কাজ হচ্ছে সমুদ্রে পানির নিচদিয়ে চুপিসারে শত্রুর জাহাজ উড়িয়ে দেওয়া।

 

Special Warfare তথা Naval commando group কে তিনটি Branch এ ভাগ করা হয়েছে। যথাঃ (1) SEAL (Sea Air And Land) (2)SBCC (Special Boat Combat Crew) (3)EOD (Explosive Ordnance Disposal) / Bomb Disposal. সর্বপ্রথম নিজেকে Naval Commando রুপে আত্নপ্রকাশ করার পর Commando দেরকে এই তিনটি Branch এ বিভক্ত হয়ে Branch ভিত্তিক বিভিন্ন প্রশিক্ষন গ্রহন করতে হয়। Naval Commando Basic Course কে সংক্ষেপে NCB এবং বিভিন্ন Branch ভিত্তিক কোর্সকে Naval Commando Advance সংক্ষেপে NCA বলা হয়,আবার Branch ভিত্তিক কোর্সের উপর ডিটেইলস কোর্সকে Specialist কোর্স বলা হয়। অপরদিকে Diving and Salvage wing এর অধীনে Clearance Diver-3, Clearance Diver-2, Clearance Diver-1 কোর্স রিচালিত হয়। Clearance Diver কে সংক্ষেপে CD বলা হয়। এখানে CD-3,CD-2,CD-1 Course Qualified কে পর্যায়ক্রমে অফিসার পদে পদন্নোতি করা হয়। এখানে আরো উল্লেখ্য যে প্যারাট্রুপিং Naval Commando Basic Course এর একটি অংশ অর্থাৎ সকল Naval Commando হল Para Commando, Naval Commando দের Para Course বাংলাদেশ সেনাবাহিনির SI and T (School of Infantry and Tactics) এর অধীনে BPC (Basic Para Course) মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

 

কর্মজীবন ডট কম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার দায় লেখকের সম্পুর্ন নিজের। ধন্যবাদ।