অন্যান্য ইতিহাসের মতন '৭১ এর যুদ্ধের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিবীরত্ব, শৌর্য্য এবং স্ট্রাটেজির কথাই আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। স্ট্রাটেজির গুরুত্ব যেকোন মিলিটারী ক্যাম্পেইনের ক্ষেত্রেই সর্বাধিক। কিন্ত যুদ্ধাস্ত্র যদি সেকেলে হয়, কোন স্ট্রাটেজি, কোন বীরত্বই কিন্ত শেষ রক্ষা করতে পারে না। ৭১এর যুদ্ধ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। পাকিস্তান সরকার যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরেই বুঝে যায় এ যুদ্ধে জেতা সম্ভব না। বেশিরভাগ সৈনিক এই কঠিন সত্যটা বুঝে যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করার ইচ্ছাও হারিয়ে ফেলে। হারা যুদ্ধকে আর যেচে লড়ে? বেশিরভাগ সৈনিক তখন ধর্ষণের মত অপেশাদার কর্মে জড়িয়ে পড়ে। খোদ জিন্নাহ সাহেব নাকি সৈনিকদের বাঙ্গালি ধর্ষণে উৎসাহ যোগাতেন।

 

নাপাক সরকারের অনেকেই জানত যুদ্ধ হলে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঠেকাতে গেলে ভারতকে আটকানোর একটাই উপায় আছে। সেটা হচ্ছে আমেরিকা এবং চীনকে যুদ্ধে জড়ানো। ফলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্ব, নতুন সরঞ্জাম কেনার বদলে, সব টাকা খরচ করে ওয়াশিংটনের লবিস্টদের পেছনে- আমেরিকান সেনেটের এবং কংগ্রেসম্যানদের লিগ্যাল ঘুঁশ দিতে  ( সে কেচ্ছা পরে হবে )। ইনফ্যাক্ট এতে তারা প্রায় সফলও হয়। কারন তখন ঠান্ডা যুদ্ধের আবহে ভারত-রাশিয়া অবিচ্ছেদ্য এক্সিস। তার মধ্যে বাংলাদেশ চলে এলে, ভারত মহাসাগরে সোভিয়েত আধিপত্য বাঁধা। ফলে বাংলাদেশের জন্ম ঠেকাতে পাকিস্তানের থেকেও আন্তর্জাতিক মার্কেটে বেশী সক্রিয় ছিল আমেরিকা। শুধু রাশিয়ার হুমকিতে সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় নি। বাদবাকি সব কিছুই করেছে।

 

তখন পাকিস্তানের বিমান বাহিনীকে সাহায্য করতে সৌদি আরব, জর্ডন, সিরিয়া, ইরাণ সবাই অত্যাধুনিক বিমান দিয়ে, বৈমানিক দিয়ে সাহায্য করেছে। মনে রাখতে হবে, এই সব ইসলামিক দেশগুলি তখন সবাই আমেরিকার দাসানুদাস। তার ওপরে তারা মনে করেছিল, বাংলাদেশের জন্ম মানে, ইসলামের ভ্রাতৃত্বের ওপর আঘাত। ফলে একটি মুসলিম দেশও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য ত করেই নি-বরং চারটি ইসলামিক দেশ ( সৌদি, জর্ডন, সিরিয়া এবং ইরান) পাকিস্তানকে অত্যাধুনিক প্লেন দিয়ে সাহায্য করেছে। এটা জেনেও যে পাকিস্তান বাংলাদেশে গণহত্যা চালাচ্ছে। যুদ্ধের কদিন বাদেই ভারত পুর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব রানওয়ে ধ্বংস করে। ফলে ইরানের বিমান ঘাঁটি থেকে পাকিস্তানের যুদ্ধ বিমান উড়ে যেত বা লুকিয়ে রাখা হত। তবে হ্যা আমেরিকার তুলনায় তা নগন্য। কারন নিক্সন তখন একবার চীনকে ভারত আক্রমণ করতে প্ররোচনা দেয় -আবার ইরান এবং জর্ডনের মাধ্যমে যুদ্ধ বিমান পাঠায়। সাথে সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ানকে হুমকি। হ্যা, একবার না, তিনবার ব্রেজনেভকে ফোন করেছিলেন নিক্সন। তিনবারই ব্রেজনেভ বলেন- আরে মশাই যুদ্ধ থামাতে হবে ত, শেখ সাহেবের নেতৃত্ব স্বীকার করে নিতে পাকিস্তানের মিলিটারি জুন্টাকে চাপ দেন নি কেন? আসলে তখন সোভিয়েত-পাকিস্তান সম্পর্ক খারাপ ছিল তাও না। সোভিয়েত ইউনিয়ান এবং চীন -কিন্ত বাংলাদেশ আসলে চায় নি। তারা চেয়েছিল শেখ মুজিবরের প্রধানমন্ত্রীত্ব পাকিস্তানের মিলিটারি শাসক মেনে নিক। একমাত্র হেনরী কিশিঞ্জার তাবেদারি করেছে পাকিস্তানের যঘন্য মিলিটারী শাসকদের। ইউ এন এ সিনিয়ার বুশ পারলে প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধ বিরতির রিজল্যুউশন আনতেন। আর সোভিয়েত ইউনিয়ান ভেটো দিত। প্রক্সি ওয়ার ( ইরান বা জর্ডন), ব্রেজনেভকে হুমকি, চীনকে উস্কানি ভারত আক্রমনের জন্য, ইউ এনে যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাব, ভারত মহাসাগরে ইউ এস টাস্কফোর্স এবং ইউ এস এস এন্টারপ্রাইজ পাঠানো ভারতের নৌবাহিনীকে ভড়কানোর জন্য-আমেরিকা বাংলাদেশের জন্ম আটকানোর জন্য ওই সময় পুরো মরিয়া।

 

 

সত্যি কথা বলতে কি-বাংলাদেশের জন্ম আটকাতে পাকিস্তানের সেনা বাহিনীও আমেরিকার নেতৃত্বের মতন আন্তরিক ছিল না! সমস্যা হচ্ছে এর পেছনে ঠান্ডার যুদ্ধের কারন তো ছিলই, পাকিস্তানের প্রচুর টাকা ওয়াশিংটনের লবিস্টদের কাছেও গেছে। শোনা যায় পাকিস্তান তখন এত টাকা খরচ করেছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশের রাজনীতিবিদদের কিনতে , তারা কিন্তু তাদের নৌবাহিনী বা বিমান বাহিনী আধুনিকরনে সেই ভাবে টাকা ঢালে নি। এর ফলে পাকিস্তানের সমর সজ্জা ভারতের থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে।

 

আমি মূলত ইতিহাসের সেই দিকটাই আজ তুলে ধরব। প্রথমেই নৌযুদ্ধে আসি। বলতে গেলে যুদ্ধ শুরুর দুদিনের মধ্যেই গোটা ভারত মহাসাগরের দখল ভারতের নেভির হাতে আসে। করাচি এবং চিটাগং-দুটো বন্দরই অবরুদ্ধ করে রেখেছিল ভারত। এবার এই প্রসঙ্গে মজার তথ্য দিই । করাচি পোর্ট অবরোধের প্রথম দিনই পাকিস্তানের ডেস্ট্রয়ার পি এন এস খাইবার ডুবিয়ে দেয় ভারতের ওশা মিসাইল বোট। পি এন এস খাইবার আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বৃটিশ ডেস্ট্র্যয়ার যা ১৯৪৩ সালে প্রথম যুদ্ধে নামে। ১৯৫৬ সালে বৃটেন তা পাকিস্তানকে বেচে দেয়। অর্থাৎ প্রায় ২৮ বছরের পুরাতন প্রযুক্তি - তাও পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে - যাদের স্পেয়ার স্পার্টস দুর্নীতির জ্বালায় আদৌ কোন কিছু মেইনটেইন হত কি না কে জানে। সেখানে ওসা মিশাইল বোট অত্যাধুনিক বৃহৎ টর্পেডো বোট । লেটেস্ট রাশিয়ান টেকনোলজি। ভারতের নেভিতে এসেছে ১৯৭১ সালে। পরের দিন পাকিস্তানের আরো দুটো যুদ্ধজাহাজ ডোবে- পি এন এস শাহজাহান এবং পিন এস মুহাফিজ। ঘাতক সেই আই এন এস ভীর - যা অত্যাধুনিক মিসাইল বোট। এর মধ্যে পি এন এস শাহজাহান আসলে বৃটিশ নেভির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের ডেস্ট্র্যয়ার -সেই ১৯৪৩ এর তৈরী। এস মুহাফিজ তৈরী হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। সেখানে আই এন এস ভীর ভারতের নেভিতে এসেছে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে। এবার আপনারাই বুঝে দেখুন। মাত্র তিনটে রাশিয়ান ওশা মিশাইল ক্লাস বোট নিয়েই ভারত পাকিস্তানের ডেস্ট্রয়ার দের একদম দফারফা করে দেয় (অপারেশন ট্রাইডেন্ট) ।

 

মনে রাখতে হবে এই সব বোট গুলি ডেস্ট্র্যারদের থেকে অনেক ছোট ( ১/১০ ভাগ হবে হয়ত)। কিন্ত বোট গুলি ছিল অত্যাধুনিক। সেখানে পাকিস্তান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাতিল নৌবহর নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। '৭১ এর নৌ যুদ্ধে পাকিস্তান একটাই সাফল্য পায়। সেটা হচ্ছে পাকিস্তানের সাবমেরিন পি এন এস হাঙ্গর আই এন এস খুকরীকে ডুবিয়েছিল। এর কারন ও সেই এক। পি এন এস হাঙ্গর কমিশন হয় ১৯৬৯ সালে। মানে একদম অত্যাধুনিক সাবমেরিন সেটি। সেখানে আই এন এস খুকরী, পুরাতন ফ্রিগেট-কমিশন বয়সকাল ১৯৫৬। পাকিস্তানের আরেক সাবমেরিন পি এন এস গাজি, বিশাখাপত্তনম বন্দরে বিস্ফোরনেই ডুবে যায়। শোনা যায়, নিজেদের পাতা মাইনে নিজেরাই মরে। এই গাজি ও অতি প্রাচীন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকান সাবমেরিন। তবে ইলেক্ট্রিক ক্লাস হওয়ার কারনে এর প্রযুক্তি সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের সব থেকে এগিয়ে ছিল। কিন্ত ১৯৭১ এ তা ছিল অচল সিকি।

 

বাংলাদেশে নৌ যুদ্ধ কিছু হয় নি। পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ডের হাতে ছিল মোটে ৪ টে গানবোট। যুদ্ধ জাহাজ একটিও ছিল না। ইচ্ছা করেই রাখেনি পাকিস্থান। কারন তারা জানত পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ জাহাজ রাখা মানে ওটা যুদ্ধের পরে বাংলাদেশে হাতে যাবে। পাকিস্তানের এই গানবোটগুলো মূলত ব্যবহৃত হয়েছে নির্বিচারে বাংলাদেশের নিরীহ লোকদের মেশিনগানের গুলিতে মারার জন্য। যুদ্ধ শুরু হলে, যুদ্ধের ছদিনের মধ্যেই চারটি গানবোটই ডুবে যায় ভারতের বিমান আক্রমনে । এবার আসি আকাশ যুদ্ধে। '৭১ এর যুদ্ধে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী লড়তেই পারেনি। যেটুকু উড়েছে, প্রায় সবটাই পাকিস্তানের আকাশে ভারতের আক্রমন ঠেকাতে। পাকিস্তানের বিমানও ছিল পুরোনো- এফ -৬ -যা মিগ-১৯ এর চৈনিক ভার্সন । এবং কানাডিয়ান সাবরে। সেখানে ভারতের হাতে '৭১ সালে তুলনায় অত্যাধুনিক মিগ-২১, সু-৭ -এই দুটী ফাইটার প্লেন তখন সোভিয়েত ইউনিয়ানের ও মুখ্য ফাইটার প্লেন । সাথে ছিল বৃটিশ হান্টার-যা অবশ্য সাবরের মতন পুরোনো। যদিও জর্ডন এবং সৌদি আরব আমেরিকান এফ সিরিজের প্লেন পাকিস্তানে পাঠিয়ে ছিল-কিন্ত এর কোন কিছুই তখন মিগ-২১ বা সু-৭ এর সমতুল্য ছিল না।

 

আসলে আমেরিকার আইন অনুযায়ী আমেরিকা তার বন্ধু দেশকেও অত্যাধুনিক ফাইটার প্রযুক্তি দিতে পারে না-এক ধাপ পেছনের প্রযুক্তি দিতে তারা বাধ্য। সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ান ভারতকে দিয়েছে, তাদের লেটেস্ট ফাইটার প্লেন মিগ-২১ ও সু-৭। ফলে জর্ডন, সৌদি ইত্যাদিদের দিয়ে প্রক্সি যুদ্ধ করিয়েও আমেরিকা সুবিধা করতে পারে নি-কারন মিগ-২১ ঠেকাতে গেলে তাদের নিজেদের যুদ্ধে নামতে হত। এই সত্য জানা ছিল পাকিস্তানের ও । ফলে তারা যুদ্ধ না করে অধিকাংশ সময় ইরানের বিমান ঘাঁটিতে ফাইটার প্লেন লুকিয়ে রাখাই শ্রেয় বলে মনে করত। যুদ্ধের ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের আকাশ সম্পূর্ন ভাবে ভারতের দখলে চলে আসে। অর্থাৎ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানে নৌবাহিনী তৈরী হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাতিল নৌজাহাজ সস্তায় কিনে। কোন আধুনিকরন করেনি '৭১ এর যুদ্ধ আসন্ন জেনেও। বিমান বাহিনীতেও একই অবস্থা। তারা টাকা খরচ করেছে বড়দা আমেরিকাকে মাঠে নামিয়ে। স্ট্রাটেজি হিসাবে খুব ভুল কিছু না। কিন্ত যুদ্ধ শুরু হলে যে তারা কয়েকদিন ও টিকবে না-এটা প্রথম থেকেই তাদের অজানা ছিল।

 

মনে রাখতে হবে সুহৃদ সোভিয়েত ইউনিয়ানও পাকিস্তান ভাগ চায় নি-কারন পাকিস্তানের সাথে সোভিয়েতের সম্পর্ক মোটেও খারাপ ছিলনা । ইউ এন রিসোলিউশনে ভিটো না দিলে, আমেরিকা ইউ এনের শান্তিবাহিনীর ছাতার তলায় ইউ এস এস এন্টারপ্রাইজকে নামিয়ে দিত। ইনফ্যাক্ট একবার ইউ এন যুদ্ধ বিরোধি রিসোলিউশন পাশ করাতে পারলে, ভারতের বিরুদ্ধে আমেরিকার সরাসরি যুদ্ধে নামার সীলমোহর পেয়ে যেত ইউ এন পিস কিপিং ব্যানারে। তবে ম্যাকেন শর ইন্টারভিউতে শুনেছি, আমেরিকা যুদ্ধে নামবে, এটা ধরেই উনি স্ট্রাটেজি ঠিক করেছিলেন। তার মধ্যে একটা হচ্ছে ডিসেম্বরের শীতে আক্রমন । যাতে উত্তর থেকে বরফ পেরিয়ে চীন বেগ দিতে না পারে। না হলে ম্যাকেনশর মতে অক্টোবরেই তারা তৈরী ছিলেন আক্রমনের জন্য।

 

এই মার্চ মাসে শ্রদ্ধা জানাই এদেশের সকল শহীদ সহ সকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যাদের আত্বত্যাগের বিনিময়ে আজকের স্বাধীনতা।