১৭৭২ সাল হতে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কোলকাতা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান ঘাটি হওয়ায় ভারতের রাজধানী এখানেই করেছিল ব্রিটিশরা। সেই আমল থেকেই কোলকাতা বন্দরকে ঘিরে ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছে উন্নত শহর। ব্রিটিশদের উন্নয়নের ছোয়ায় কোলকাতা ও এর আশেপাশের অঞ্চল, পূর্ব বাংলা থেকে অনেক এগিয়ে যেতে থাকে। অবহেলিত এবং শোষনের কবলে ধুকে ধুকে চলতে থাকে পূর্ব বাংলার অর্থনীতি, সাধারন মানুষের জীবন। কোলিকাতার মানুষের কাছে শ্রেণী তৈরি হয়। তারা নিজেদেরকে ব্রিটিশদের মত সভ্য শ্রেণীতে ফেলত, আর পূর্ব বাংলার মানুষকে চাষাভুষা হিসাবেই বিবেচনা করে আসত অতিত থেকেই। এখনো করে। সোসাল মিডিয়ায় প্রায় দেখা যায় বাংলাদেশকে তারা ভিক্ষুক বলে অবিহিত করে। এখন কেন করে সেটা একটু আলোচনা করব।

 

শুরুতেই বলে রাখি, বাংলাদেশের সাথে পশ্চিম বঙ্গের তুলনা চলে না। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। তারা পরাধীন রাজ্য। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হবার সুবাধে তাদের অবোকাঠামো অনেক আগে থেকেই উন্নত। দেশের আয়তন আর জনসংখ্যা হিসাবেও বেশ পার্থক্য রয়েছে। আর ভারত আমাদের থেকে উন্নত দেশ এখন পর্যন্ত সে ব্যাপারেও ভনিতা করবার ইচ্ছে নাই। তাদের সক্ষমতাও বেশি। তারপরো কিছু বিশয়ে সল্প পরিসরে এই আলোচনা।

 

সর্বশেষ ২০১৭ সালে পশ্চিম বঙ্গের জিএসডিপি (Gross State Domestic Product) দাড়িয়েছে প্রায় ৯,২০,০০০ কোটি ইন্ডিয়ান রুপি বা ১৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশের জিডিপি সর্বশেষ ২০১৭ সালে ছিল ১৯,৫৬,০৫৬ কোটি বাংলাদেশি টাকা যা প্রায় ২৫৪ বিলিয়ন ডলারের সমান। ইন্ডিয়ান ১ রুপি= ১.২৫ টাকা হিসাবে পশ্চিম বঙ্গের জিএসডিপি বাংলাদেশি টাকায় চলতি মুল্যে ১১.৫ লক্ষ কোটি টাকার সমান। অর্থাৎ বাংলাদেশের জিডিপি পশ্চিম বাংলার তুলনায় প্রায় ১.৭০ গুন বেশি।

যদিও ওদের জনসংখ্যা সাড়ে নয় কোটি আমাদের ১৬ কোটি হিসাবে আমাদের জনসংখ্যা ওদের থেকে ১.৬৮ গুন বেশি। আয়তনে বাংলাদেশ ওদের থেকে ১.৬৬ গুন বড়। সেই হিসাবও যদি করি আমরা কি খুব পিছিয়ে??

 

এবার আসি বাজেটে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পশ্চিম বঙ্গের বাজেটের আকার ছিল ১,৮২,২৯৭ কোটি ভারতীয় রুপি। বিনিময় হার ১ রুপি= ১.২৫ টাকা হিসাবে, আমাদের টাকায় দাদাদের বাজেট প্রায় ২,২৭,৮৭১ কোটি এর সমান। বাংলাদেশের বাজেটের আকার ছিল ৪,০০,২৬৬ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে তাদের বাজেট আমাদের বাজেটের মাত্র ৫৭% এর মত। এক হিসাবে অর্ধেক বলা চলে।

 

অর্থনীতির আকার হিসাবে পশ্চিম বঙ্গ ভারতের সব রাজ্যেগুলার ভেতর ৫ম। আর বাংলাদেশের জিডিপির আকার হিসাব করলে শুধুমাত্র মহারাষ্ট্র আমাদের থেকে বৃহৎ অর্থনীতি। এখানে বলে রাখা ভাল ভারত বিশাল দেশ। আমাদের থেকে ২১ গুন বড়। তাই ওদের ২.২৫ ট্রিলিয়নের জিডিপির সাথে আমাদের তুলনা চলে না। উল্লেখ্য বাংলাদেশের সাথে তাদের উত্তর প্রদেশের তুলনা চলে যেখানে উত্তর প্রদেশের আয়তন জনসংখ্যা দুইটাই বাংলাদেশের থেকে বেশি হওয়া সত্বেও জিএসডিপি বাংলাদেশের থেকেও কম। মাত্র ২২৫ বিলিয়ন ডলার।

ভারতের গড় মাথা পিছু আয় প্রায় ১৮০০ ডলার। পশ্চিম বঙ্গের মাথা পিছু আয় ভারতের গড় হিসাবে বেশ কম। ১৬০০ মার্কিন ডলারের কিছু বেশি। সর্বশেষ ২০১৭ সালে বাংলাদেশের মাথা পিছু আয় বেড়ে দাড়িয়েছে ১৬০২ মার্কিন ডলারে। আর হয়ত ৫-৭ বছর পর ওদের সাথে তুলনা করলে গানিতিক হিসাবগুলা বাংলাদেশের পক্ষ নিবে সেটা অনুমান করাই যায়। এখন শুধু আমাদের এই গতি নিরবিঘ্ন ভাবে ধরে রাখতে হবে।

 

যদি মাথাপিছু ঋনের কথা বলি তবে বাংলাদেশ শুধু পশ্চিম বঙ্গ নয়, ভারতের থেকে অনেক ভাল অবস্থানে আছে। বাংলাদেশের ঋন ২০০২ সালে জিডিপির প্রায় ৫০% ছিল যা ২০১৬ সালে কমে মাত্র ২৭.২% এ নেমে এসেছে। আমরা ঋন করি ঠিক আছে, কিন্তু সেটা পরিশোধ করার ক্ষমতাও আমাদের আছে আমরা সেটা দেখিয়ে দিয়েছি। চলতি অর্থবছরে ঋন ও সুদ পরিশোধ বাবদ বাংলাদেশ ৪১,৬২৭ কোটি টাকা বরাদ্ধ করেছে। কিন্তু ইন্ডিয়ার অবস্থা এক্ষেত্রে করুন বলা চলে।২০১৬ সালে ২.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপির বিপরিতে প্রায় ৬৯.৫% ঋনের বোঝা রয়েছে তাদের। অভ্যন্তরীণ ঋনের হিসাব বাদ দিয়ে শুধু বহির্বিশ্বের ঋন হিসাব করলে সর্বশেষ ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত বহির্বিশ্বের কাছে তাদের দেনা প্রায় ৪৮৫.৮ বিলিয়ন ডলার যা তাদের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ ৩৯৯ বিলিয়ন থেকেও অনেক বেশি।

 

বাংলাদেশের এক্সটার্নাল ডেট ২০১৬ পর্যন্ত মাত্র ২৫.৯৬ বিলিয়ন ডলার যার বিপরীতে আমাদের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ রয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের। পশ্চিম বঙ্গের ঋনের কথা আর কি বা বলব। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ওদের ঋনের পরিমান বেড়ে ৩.৪৪ লাখ কোটি রুপি হয়েছে। এত টাকার সুদ দিতে গেলে তাদের ট্যাক্স হতে আয় ৫০,৭৭৩ কোটি রুপির ৮১% ই চলে যাবে।

 

সবশেষে একটা বিষয় না বললে নয়। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী থাকা কালিন পশ্চিম বঙ্গের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে পুর্ব বাংলার চাষাভুষাদের কষ্টের ফসল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পুর্ব বাংলা থেকে পাট যাওয়া কমে গেলে স্থবির হয়ে পরে পশ্চিম বঙ্গের চটকল্গুলো। থেমে যায় অর্থনীতির চাকা। দেশ ভাগের পর থেকে গুরুত্ব হারাতে থাকে পশ্চিমের শহরগুলা। চাষাভুষাদের কষ্টের ফসল, জেলেদের ধরা ইলিশ কম দামে কিনে অধিক মুনাফার ব্যাবসাও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে তারা আর তুলনামুলক ভারতের অন্য রাজ্যের সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠেনি।

 

১৯৪৭ সালের পর শুরু হয় এপার বাংলার মানুষের উপর আরেক দফা শোষন। পাকিস্তানের আয়ের থেকে বেশি আয় করেও পুর্ব বাংলার মানুষের কপালে জোটে পাকিস্থানের বাজেটের মাত্র ২৫%। এদেশের টাকা নিয়ে গিয়ে তারা লাহোর, করাচিকে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসায়। ১৯৭০ এর বন্যায় তারা এক টাকা সাহায্য করেনি উলটা বৈদেশিক সাহায্যের টাকাও পশ্চিম পাকিস্থান নিয়ে যায়। আর আজ এই বাংলাদেশিরা স্বাধীনতার মর্ম বুঝেনা। ১৯৭১ এ অবকাঠামো সব ধ্বংস হয়ে যায়। কিছুই ছিল না। রাস্তা, ব্রিজ, বুদ্ধিজীবী সব কিছুই হারাতে হয়েছে বাংলাদেশকে। সেই শুন্য থেকে শুরু। আজ আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। খুব বেশি না হয়ত ৮-১০ বছরের মধ্যেই পাকিস্থানকে টপকে সাউথ এশিয়ার দ্বীতিয় বৃহৎ অর্থনীতি আমরাই হব। তাই যারা আজ আমাদের ভিক্ষুক বলতেছে, তাদের মুখে সোনা ফলুক। ইনশাল্লাহ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না। আমরা পারি সেটা আমরা প্রমান করেছি, প্রমাণ করে যাবো।