চীন – বাংলাদেশ সম্পর্কঃ

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর গর্ব মিগ-২৯ এবং বাংলাদেশ নেভির গর্ব ফ্লাগশিপ উলসান ক্লাস ফ্রিগেট বিক্রির পেছনের নোংরা রাজনীতি।

 

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহরে এখন পর্যন্ত সব থেকে শক্তিশালী হাতিয়ার ৮ টি রাশিয়ার মিখোয়ান মিগ-২৯। ১৯৯১ সালের ঝড়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তাদের বহরে থাকা অনেক বিমান হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রেক্ষিতে ১৯৯৫ সালে সরকার পরিবর্তনের পর বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য যুগোপযোগী বিমান কেনার সিদ্ধান্ত হয়। ঠিক একি সময়ে নেভির উন্নতির জন্য বাংলাদেশ প্রথমবারের মত ফ্রিগেট কেনার পরিকল্পনা করে। চীন তাদের তৈরি এফ-৭ এমবি বিমান কেনার জন্য বাংলাদেশের কাছে প্রস্তাব করে। কিন্তু সরকার চেয়েছিল আরো আধুনিক ক্ষমতাসম্পন্ন বিমান কিনতে। নেভির ফ্রিগেটেও চীন সর্বনিম্ন $৭৮ মিলিয়ন ডলার অফার করে। চীনের দেওয়া এফ-৭ এমবি এর প্রস্তাব উপেক্ষা করে বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে ১৬ টি মিগ-২৯ বিমান কেনার জন্য চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী ৳১২৪ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ৮ টা মিগের চালান হাতে পায় বাংলাদেশ। একেকটি মিগ-২৯ বিমানের দাম পড়ে $১১ মিলিয়ন ডলার। $৩৬ মিলিয়ন ডলার বরাদ্ধ দেওয়া হয় ট্রেইনিং ও স্পেয়ার পার্টস বাবদ। চুক্তি অনুযায়ী ১০ জন পাইলট এবং ৭০ জন টেকনিশিয়ান রাশিয়া থেকে প্রশিক্ষন নেয়।

 

বাংলাদেশ মিগ-২৯ কেনার পর ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ নেভির ক্ষেত্রে অর্ডার পায় দক্ষিন কোরিয়ার দাইউও শিপইয়ার্ড। বাংলাদেশ চেয়েছিল ভিন্য প্লাটফর্ম ও আধুনিক যুগোপযোগী যুদ্ধাস্ত্র। বলার অপেক্ষা রাখেনা চীন বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত ভাল চোখে দেখেনি। হয়ত চীনের সাথে তৎকালীন সরকারের শীতল সম্পর্কের এটা আরেকটি অন্যতম কারন। ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে যখন আবারো সরকার পরিবর্তন হয় ২০০১ এ।

 

বেগম জিয়া তখন ক্ষমতায়। শুরুতেই তিনি মিগ-২৯ এর বাকি চালান স্থগিত করে, বহরে থাকা মিগ-২৯ বিমান গুলোকে গ্রাউন্ডেড করেন। সাউথ কোরিয়া থেকে উলসান ক্লাসের ২ টি ফ্রিগেটের একটির চালান দেশে এসেছিল। সেটাকেও ডিকমিশন করেন। কমনওয়েলথ সাংবাদিক সমিতির সাথে নিজ অফিসে দেখা করার সময় তিনি বিষয়টি জনসম্মুখে আনেন। পাকিস্তানের ডন পত্রিকা এবং ইন্ডিয়ার দি হিন্দু পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী বেগম জিয়া তার বক্তব্যে যে কারন গুলি তুলে ধরেছেন তা নিম্নরুপ-

 

১. অধিকাংশ মিগ-২৯ বিমান গ্রাউন্ডেড। উড়তে সক্ষম নয়।

২. তার সরকার এটা বিক্রির জন্য চেষ্টা করছে যদি ক্রেতা পাওয়া যায়

৩. মিগ-২৯ বিমান গুলা কেনাতে দূর্নীতি হয়েছে। রাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়নি।

৪. মিগ-২৯ বিমানগুলার রক্ষানা বেক্ষনে রাষ্ট্রিয় কোষাগারে বাড়তি চাপ পড়বে যার জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত নয়।

 

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে যেই যুক্তি গুলা তুলে ধরা হয়েছিল সেগুলা মোটামুটি এরকম-

১. বিমান বাহিনীর মিগ-২৯ রক্ষানাবেক্ষন অন্য ৫ টা স্কোয়াড্রোন বিমান রক্ষনা বেক্ষনকে হুমকির ভেতর ফেলবে। কারন, বিমান বাহিনীর জন্য আলাদা ভাবে বাড়তি বরাদ্ধ দেওয়া লাগবে যেটা সম্ভব নয়।

২. চীনের তৈরি এফ-৭ এমবি থাকতে রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করে অনেক টাকার অপচয় করা হয়েছে। যুক্তি হিসাবে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এফ-৭ সিরিজের বিমান ব্যাবহার করে এবং রক্ষনাবেক্ষন করে অভ্যস্ত। সেখানে এফ-৭ না কিনে অর্থের অপচয় করা হয়েছে।

৩. নিয়ম অনুযায়ী সবথেকে নিম্ন দাম প্রস্তাবকারীকে কাজের নির্দেশ দেওয়ার কথা। উলসান ক্লাস ফ্রিগেট কেনার ক্ষেত্রে বিগত সরকার সেটা মানেনি। $৭৮ মিলিয়ন ডলারের চীনের দেওয়া প্রস্তাব নাখোচ করে $৯৩ মিলিয়ন ডলারে দক্ষিন কোরিয়াকে কাজ দিয়ে অর্থের অনিয়ম করা হয়েছে।

 

এসবের প্রেক্ষিতে দৈনিক ইত্তেফাক, এবং ডেইলি স্টার বেগম জিয়ার বক্তব্য তুলে ধরেছেন এভাবে ‘’বাংলাদেশ এগুলাকে রেখে মূল্যবান অর্থ হারাচ্ছে’’। যাইহোক এরপর মিগ-২৯ নিয়ে মামলা করা হয়। বাংলাদেশের মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতার কারনে এবং বিমান বাহিনীর বাধার সম্মুখে এগুলাকে বিক্রি করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। এর প্রেক্ষিতে পরবর্তিতে চীন থেকে এফ-৭ কেনা হয়। রাজনীতির জটিল প্যাচে পড়ে আমাদের দ্বীতিয় ফ্রিগেটটি আর আসেনি। মিগ-২৯ এর বাকি ৮ টা বিমান দিয়ে স্কোয়াড্রন পূর্ন করা আজো সম্ভব হয়নি। একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, চীনের কি কোন হাত ছিল এই ঘটনার পেছনে???

 

যাইহোক সব থেকে বড় কথা হল ৮ টি মিগ-২৯ আমাদের বর্তমান বিমান বাহিনীর মেরুদন্ড। ৮ টি মিগ-২৯ বিমানই এখনো ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ এই মন্ত্রে দেশের আকাশ সীমা পাহারা দিয়ে যাচ্ছে। আর সমুদ্রে এখন পর্যন্ত আমাদের সব থেকে শক্তিশালি ফ্রিগেট বিএনএস বঙ্গবন্ধু (উলসান ক্লাস) বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির নিরাপত্তা দিয়ে চলেছে।