কানাডা মাইগ্রেশনের সুযোগ, প্রিপারেশন, প্রসেসিং এবং সফল সেটেলমেন্ট নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা, গুজব, ভয় এমনকি উচ্চাভিলাষী ভাবনা আমাদের মধ্যে হরহামেশাই কাজ করে।  ১০ পর্বের ধারাবাহিক ফিচার লিখছি আপনাদের জন্য আশাকরি অনেকেই উপকৃত হবেনঃ
 

পর্ব ০১ঃ কানাডা কি আমার জন্য?

মাইগ্রেশনের সুযোগ যুগে যুগে ছিলো আজো আছে। আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগেও মানুষ সুদূর চীন দেশে যেত উচ্চ শিক্ষা দীক্ষার আশায়। কিছুদিন আগেও আন্তমহাদেশীয় মাইগ্রেশন বেশ সহজ আর হাতের নাগালেই ছিলো কিন্তু পথ পরিক্রমায় মাইগ্রেশন আজ সোনার হরিন! প্রথমে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কেন মাইগ্রেশন করতে চান! মনে রাখতে হবে বরাবরই এপার থেকে ওপার অনেক সবুজই মনে হয়।

 

আমি শিওর আমার মত আপনারাও আজীবন শুনে এসেছেন এই দেশে নাকি মশা মাছি নাই! বিশ্বাস করেন, ডাহা মিথ্যা কথা। ভ্যানকুভারের মত পরিচ্ছন্ন শহরেও মশা মাছি হরহামেশা দেখা যায়। বনে বাদাড়ে ক্যাম্পিং করতে যাবেন? মশার পাল আপনাকে ফানুসের মতো উড়ায় নিয়ে গেলোও অবাক হবো না! অনেকেই বলেন বাচ্চাদের জন্যই এই দেশে আসা। শোনেন নিজের অভিগ্যতা থেকে বলি। আমার পরিচিত এক বড় ভাইয়ের বাচ্চা সেদিন স্কুলে ভর্তি হলো। তিন দিনের মাথায় সে কান্নাকাটি করে একাকার। স্কুলে পাশে বসা এক ছেলে নাকি তাকে বলসে তোর চামড়া তো কালো, সাথে এমন এক রেসিস্ট গালি দিয়েছে তা এই ফোরামে উচ্চারণ করার মত না! ভাবেন অবস্থা?

 

আপনার বয়স, আপনার কোর এক্সপেরিয়েন্স আর এডাপ্টিবিলিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ধরুন, আপনি দেশে আপনার ফিল্ডে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীতে আপনার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর আপনি ভাবছেন কানাডা এসে এয়ারপোর্ট থেকে নেমেই সমমানের চাকুরীতে ইন্টারভিউ পেয়ে যাবেন । এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই যদি আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন মাইগ্রেশন আপনার জন্যই তবে তা হিতে বিপরীর হবার সম্ভাবনাই বেশী!

 

তাহলে করণীয়?

এবার আসি মূল কথায়। ধরুন আপনি প্রজেক্ট ম্যানেজার কিংবা প্রোগ্রামার বা ব্যাংকার ছিলেন। নিঃসন্দেহে আপনি আপনার ফিল্ডে অত্যন্ত দক্ষ। তবে খেয়াল রাখতে হবে আপনার এক্সপার্টাইসের ডিমান্ড কানাডিয়ান জব মার্কেটে কতটুকু মূল্যবান। কিছু কিছু ফিল্ড থাকে যা ইউনিভার্সাল যেমন ধরুন প্রোগ্রামিং। বান্দা বাংলাদেশের বাসাবোতে থাকতে যা ছিলেন, কানাডাতে এসেও প্রায় সমান কাজের মর্যাদা পাবেন কারন ইঞ্জিনিয়ারিং এর বেশীর ভাগ প্ল্যাটফর্মই উইনিভার্সাল। তবে কিছু কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং ফিল্ড এখানে রেগুলেটেড যার জন্য আপনাকে লাইসেন্স পরীক্ষা দিতে হতে পারে যেমন ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং। আবার ধরুন আপনার ফিল্ড মার্কেটিং বা সেলস, দেশে আপনার বেশ নাম ডাক। কিন্তু এই দেশে এসে অনেক ক্ষেত্রেই আপনাকে স্ক্র্যাচ থেকে শুরু করতে হতে পারে (সবার জন্য নয়)। কারণ বাংলাদেশে যে এপ্রোচে ব্র্যান্ডিং, মার্কেটিং বা সেলস হয় এই মুল্লুকে সেই স্ট্র্যাটেজি অনেক ক্ষেত্রেই কাজে দেয় না!

 

তাহলে?

হুম, এক্সপেরিয়েন্স সাধারণত দুই ধরণের হয়।

১। কোর এক্সপেরিয়েন্স (ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ব্যাংকার ইত্যাদি)
২। ট্রান্সফারেবল স্কিল (স্টেকহোল্ডার ম্যানেজমেন্ট, কাস্টমার সার্ভিস, রিসার্চ, এনালিটিকাল স্কিল, কমিউনিকেশন ইত্যাদি।

ট্রান্সফারেবল স্কিলের সংখ্যা যাদের বেশী তারা খুব সহজেই কাছাকাছি বা সেকেন্ড প্রফেশন বাছাই করে দ্রুতই কর্ম ক্ষেত্রে যোগ দিতে পারেন। ট্রান্সফারেবল স্কিল বেশী থাকলে আপনার জন্য জব মার্কেট বড় হবার সম্ভাবনা বেশী থাকে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এক্সপেরিয়েন্সের মূল্যায়ন ১+১=২ হয় না। সেক্ষেত্রে আপনার যদি ইন্টারন্যাশনার সার্টিফিকেশন থেকে থাকে তবে তা আপনার জন্য নিঃসন্দেহে প্লাস পয়েন্ট। ইন্টারন্যাশনাল সার্টিফিকেশন যেমন পিএমপি, আইটিআইএল, সিসিএনে ইত্যাদির কদর পৃথিবীর সব জায়গায় সমান।

 

অনেকের ধারণা এখানে বাচ্চাদের জন্য এলাওয়েন্স দেয়। কথা সত্য, তবে আপনি যা এলাওয়েন্স পাবেন তার চেয়ে ঢের বেশী টাকা বাচ্চার পেছনেই চলে যাবে। এখানে পড়াশোনা আলবত ফ্রি কিন্তু দুই দিন পরপর এই প্রোগ্রাম সেই প্রোগ্রামের জন্য নানা জিনিস কিনতে কিনতে আপনি পেরেসান হয়ে যাবেন। আর পেরেন্টস দুজন কাজ করলে ডে কেয়ারের খরচটাও আপনাকে বহন করতে হবে সেটাও নেহাত কম নয়।

 

চিকিৎসা?

সেটাও মহা ভূয়া! বিশ্বাস হয় না?

হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে এসেও আপনাকে গড়পড়তা ৪-৭ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে! আমার পরিচিত এক আপা হাত কেটে একাকার। কোনো মতে ওড়না দিয়ে হাত পেচিয়ে হাসপাতালে ছুট। একটা পেইন কিলার দিয়ে পাক্কা ৫ ঘন্টা বসিয়ে রাখলো! এদের মূল প্রতিপাদ্য হল যে রোগী মারা যাওয়া অবস্থা তার প্রায়োরিটি ফার্স্ট। ভালো কথা কিন্তু তাই বলে আপা যে ভয়াবহ যন্ত্রনা নিয়ে ৫ ঘন্টা বসে থাকলো? ওয়েল, কিচ্ছু করার নাই। পরিতাপের বিষয় এখানে বেশীরভাগ হাসপাতালে ইমার্জেন্সিতে পর্যপ্ত ব্যান্ডউইথ নেই। তবে আপনি মরণাপন্ন হলে কিন্তু কথা নাই, আপনার প্রায়োরিটি ফার্স্ট!

খরচ?

হাসপাতালের খরচ ফ্রি, ডাক্তার দেখাবেন? সেটাও ফ্রি? ডায়াগনোসিস সেটাও ফ্রি?

ঔষধ?

হুম এবার আসল জায়গায় আসছেন। ঔষধ আপনাকে কিনে খেতে হবে আর ঔষধ এখানে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে আমরা সস্তায় ঔষধ কিনতে পারি তার কারণ আন্ডার ডেভেলাপ কান্ট্রি হওয়ায় আমাদের রয়ালিটি দিতে হয় না যার কারণে ঔষধ আমাদের হাতে নাগালে। কিন্তু এই মুল্লুকে গুনেগুনে টাকা পরিশোধ করে ঔষধ ক্রয় করতে হবে। চোখ আর দাঁতের রোগ হলে আপ্নে শেষ! এখানে ডেন্টিস্ট অত্যন্ত ব্যয়বহুল! চশমার ক্ষেত্রেও তাই। তবে আপনি ব্যক্তিগত ভাবে ইন্সুরেন্স কিনতে পারেন যার জন্য আপনাকে মাসে মাসে টাকা গুণতে হবে। সেক্ষেত্রে ইন্সুরেন্স কিছু অংশ আপনাকে সাপোর্ট দিবে। আবার অনেক কোম্পানী তার এমপ্লয়কে চিকিৎসার জন্য ইন্সুরেন্স দিয়ে থাকে।

 

ট্যাক্স?

বাংলাদেশে কি করেছেন ভুলে যান। যা টাকা ইনকাম করবেন তার গড়ে ৩০-৫০ শতাংশ কর উৎসতেই কেটে নিবে (আয় ভেদে)! এই টাকা দিয়েই আদতে সরকার বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে।

সোশ্যাল সাপোর্ট?

আদতে এটা কেউ নিতে চায়না। একেবারে না পারতে যেমন ধরেন আপনি কোনো ভাবেই জব ম্যানেজ করতে পারছেন না তখন চাইলে আপনি সরকার থেকে সোশ্যাল বেনিফিট নিতে পারবেন। আপনার বাসা ভাড়ার একটা বড় অংশ সরকার বহন করবে। চাকুরী না থাকায় মাসে মাসে ইন্সেন্টিভ দিবে কিন্তু সরকারের মিসকিনের খাতায় কিন্তু আপনার নাম উঠে গেল! এই অবস্থায় আপনি আপনার বাবা মার জন্য সুপার ভিসা এপ্লাই করবেন? আপনি পারবেন না! একটা নির্দিষ্ট ইনকাম না থাকলে সেটাও সম্ভব নয়!

 

এডাপ্টিবিলিটি?

এখানের আবহাওয়া কোনো ভাবেই সুখকর কিছু নয়। পুরোপুরি এডজাস্ট হতে কয়েক বছর লেগেই যাবে। বাতাসে জলীয়বাস্পের পরিমাণ অত্যন্ত কম। চুল পড়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। রোদ? এখানে রোডে ইউভি (আল্ট্রা ভায়োলেট রে) অনেক বেশী। আপনি ঘামবেন না কিন্তু হাতের চামড়া পুড়ে যাবে। শুরুর দিকে ঠান্ডার সাথে লড়াই করাও বেশ কঠিন তবে আপনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলে কোনো সমস্যাই হবে না।

 

কানাডার মূল মন্ত্রই মাল্টিকালচার। এখানে আপনার পাশে সারাক্ষন ঘুরঘুর করবে নানা দেশ থেকে আসা মানুষজন। এদের রঙ, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ভাষার বৈচিত্রের কলেবর অনেক বড়। এখানে মানুষ বেশ শান্তি প্রিয় তবে এখানেও বেলাইনের মানুষজন আছে। সম্মান রেখেই বলছি অনেক প্রভিন্সেই এখানকার আদিবাসী কিছু কিছু ক্ষেত্র সমস্যা তৈরী করতে পারে। প্রতিটি প্রভিন্সেই কম বেশী ক্রাইম জোন থাকে যা এভোয়েড করাই উত্তম। মাদক এখানে এক বিরাট সমস্যা। বিশেষ করে এখানকার আদিবাসীদের মধ্যে মাদকের আসক্তি প্রকট। কিছু কিছু এরিয়া আছে যা হুড এরিয়া নামে পরিচিত, মূলত এইসব এরিয়াতে ক্রাইম আর মাদকের ভয়াবহতা অন্যান্য এরিয়া থেকে একটু বেশী। শুনতে হয়তো অবাক লাগবে, ভ্যাঙ্কুভারের মত শহরের ডাউন টাউনে হেস্টিং নামে একটি রাস্তা আছে যার দুপাশে শয়ে শয়ে হোম লেস আর মাদকাসক্তদের লাইন। রাস্তার সামনে বসে সবার সামনেই সিরিঞ্জ দিয়ে মাদক নিচ্ছে। সরকার এদের সিরিঞ্জ সরবরাহ করে থাকে! উদ্দেশ্য এরা যাতে সেফ ড্রাগ নেই, এক সিরিঞ্জ চৌদ্দজন ব্যবহার করে সংক্রামক রোগ না বাড়ায়। এদেরকে নানা সময় রিহাবে নেয়া হয়েছে তবু লাভ হয়নি। এরা যাতে শহরে ছড়িয়ে না পরে তাই হেস্টিং এ এদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা!

 

মোদ্দা কথা, মুদ্রার উল্টো পিঠ সহজে কেউ বলতে চায় না। চেষ্টা করেছি অন্ধকার দিকটাও তুলে ধরতে। তবে ভয় পাবার কিছু নেই, অজস্র পজিটিভ ফ্যাক্টর আছে যা কিনা কানাডার মতো ডেভেলপড কান্ট্রিতে মাইগ্রেশন করতে আপনাকে প্রভাবিত করবে।

সামনের পর্বগুলোতে কানাডা মাইগ্রেশন করার ক্ষেত্রে পজিটিভ ফ্যাক্টের পাশাপাশি প্রিপারেশন আর প্রসেসিং নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো।

হ্যাপি রিডিং!

 

পর্ব ০২ঃ কানাডায় সুযোগ সুবিধা?

পর্ব ০৩ঃ কানাডায় চাকুরী সমাচার?

পর্ব ০৪ঃ কানাডার লাইফ স্টাইল আর খরচাপাতি?