কানাডা মাইগ্রেশনের সুযোগ, প্রিপারেশন, প্রসেসিং এবং সফল সেটেলমেন্ট নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা, গুজব, ভয় এমনকি উচ্চাভিলাষী ভাবনা আমাদের মধ্যে হরহামেশাই কাজ করে।

১০ পর্বের ধারাবাহিক ফিচার লিখছি আপনাদের জন্য আশাকরি অনেকেই উপকৃত হবেনঃ

 

কানাডার সরকার ব্যবস্থা অনেকটা আমাদের পার্শবর্তি দেশ ভারতের মত। কানাডার সরকার ব্যবস্থা দুই ধরনের। কেন্দ্রীয় সরকার (ফেডারেল গভর্মেন্ট) এবং প্রভিনশিয়াল সরকার । ফেডারেল গভর্মেন্ট দেশের মূল চালক আর প্রভিনশিয়ার সরকার নিজ নিজ প্রভিন্সের দেখভাল করে থাকে।

 

নিরাপত্তা?

এই মুল্লুকে নিরাপত্তা ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। নিরাপত্তা ছাড়াও মৌলিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য ফেডারেল এবং প্রভিনশিয়াল গভর্মেন্ট হাতে হাত রেখে কাজ করে। এই হাতে হাত রেখে এগিয়া চলা ভেবে আপনারা আবার ভাইবেন না এরা মায়ের পেটের দুই ভাই। মূল কথা কানাডায় আপনি যখন কোনো পন্য কিনতে যাবেন তখন প্রতিটি পন্যের উপর আপনাকে দুই ধরনের ট্যাক্স দিতে হয় যা জিএসটি এবং পিএসটি নামে পরিচিত।

 

জিএসটি হলো গুড এন্ড সার্ভিস ট্যাক্স যা সরাসরি ফেডারেল গভর্মেন্টের কোষাগারে চলে যায় আর পিএসটি হলো প্রভিন্সিয়াল সেলস ট্যাক্স যার পুরোটাই স্থানীয় সরকার বা প্রভিন্সিয়াল সরকারের একাউন্টে চলে যায়। প্রভিন্স ভেদে এই ট্যাক্স আবার উঠানামা করে যা ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারিত। আলবার্টা ছাড়া সকল প্রভিন্সেই পিএসটি প্রযোজ্য আর গড়ে আপনাকে ১২ শতাংশ ট্যাক্স (পিএসটি + জিএসটি) যেকোনো পন্যের সাথেই পরিশোধ করতে হবে।

 

কিন্তু নিরাপত্তার সাথে এর কি সম্পর্ক?

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দুই ভাই (ফেডারেল আর প্রভিন্সিয়াল) এক হয়ে নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য কাজ করেন। আরসিএমপি (রয়াল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ) হচ্ছে ফেডারেল গভর্মেন্টের পিস অফিসার (পুলিশ) যাদের কলেবর পুরো কানাডা জুড়ে আবার প্রত্যেকটা প্রভিন্স নিরাপত্তার জন্য নিজেদের পুলিশ ফোর্স নিয়োজিত করে থাকেন। রাস্তায় কোনো ঝামেলায় পরেছেন? বাসায় চুরি হয়েছে? বউ আপনাকে দাবড়ানি উপর রেখেছেন? এমনকি আপনার বাচ্চাকে আপনি কষে একটা থাপ্পার মেরেছেন? আপনি শেষ, আপনার বাচ্চা সাথে সাথে ৯১১ এ ফোন দিয়ে বলবে সে বাসায় ইন্সিকিউরড ফিল করছে।

কিন্তু আপ্নের বাচ্চা ৯১১ এ ফোন দেয়ার বিষয়টা শিখলো কোথা থেকে? উহু, এই মুল্লুকে স্কুলেই বাচ্চাদের এই টোটকা শিখিয়ে দেয়া হয়। ফোন পাবার সাথে সাথে সাইরেন বাজিয়ে বাসায় পুলিশ চলে আসবে। মানে আপনি লাইন থেকে বেলাইন হয়েছেন তো আপনি শেষ! এখানে আমলনামা খুব নিখুঁত ভাবে লিপিবদ্ধ থাকে। প্রত্যেকটা নাগরিকের জন্য উইনিক সোশ্যাল আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার আছে আর আপনি যত আকাম কুকাম করবেন তা পই পই করে পিস অফিসার আপনার আইডিতে নোট করে রাখবে। মোদ্যাকথা, আপনি যদি আইন মেনে চলেন কানাডা ইজ এ বিউটিফুল কান্ট্রি টু লিভ আর বেরাছেড়া করছেন তো মরছেন।

 

 

ইমার্জেন্সি চিকিৎসা?

ভাই ব্রাদার আর বন্ধু বান্ধবরা বলত বিদেশে নাকি ৯১১ এ ফোন দিয়ে অসুস্থতার কথা বললে ঝড়ের বেগে এম্বুল্যান্স দোরগোড়ায় চলে আসে। কথা সত্য, এমনও উদাহরণ আছে আপনি ফোন রাখতে না রাখতেই আপনার বাসায় বেল বাজছে। প্যারামেডিক আপনাকে পাঁজাকোলা করে দ্রুতগতিতে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাবে। ইয়ে মানে, ওরা যে এম্বুল্যান্সে আসে এটা মোটেও বাংলা এম্বুল্যান্সের সাথে তুলনা করবেন না। অত্যন্ত সফস্টিকেটেড এম্বুল্যান্স যেখানে লাইফ সাপোর্টের (আইসিইউ) ব্যবস্থা পর্যন্ত আছে। এমনকি গুরুতর আহত রোগীকে যাত্রা পথে এডভান্স প্রাইমারী ট্রিট্মেন্ট দেয়ার সুব্যবস্থা পর্যন্ত এই এম্বুল্যান্সে আছে। রাস্তায় যতই ট্রাফিক থাকুক না কেন এম্বুল্যান্সের সাইরেন শোনার সাথে সাথেই রাস্তার বাম লেইন ছেড়ে দেয়া আইনের অংশ। কেউ এর ব্যতিক্রম করলে সেই চালক বড় অংকের জরিমান গোনতে তৈরী থাকতে হবে। আদতে এখানের মানুষ অতি মাত্রায় ভালো, এম্বুল্যান্স এর শব্দ কানে আসার সাথে সাথে রাস্তা ছেড়ে দিবে যা হরহামেশাই চোখে পড়ে।

 

তাহলে গলদটা কোথায়?

এবার আসি আসল কথায়। ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল ট্রান্সফার প্রভিন্সিয়াল সরকারের দায়িত্ব। সাধারণত প্যারামেডিক সাপোর্ট প্রভাইডারের সাথে স্থানীয় সরকারের চুক্তি থাকে যার ভিত্তিতেই এই সেবা নাগরিক পেয়ে থাকেন।

 

কিন্তু সমস্যাটা কোথায়?

মুহতারামে হাজিরিন, ৯১১ এ ফোন দেয়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই আপনার বাসায় প্যারামেডিক এম্বুল্যান্স নিয়ে চলে আসবে কথা সত্য কিন্তু জনাব এর জন্য আপনাকে ফি দিতে হবে বৈকি, আর তা নেহাত কমও নয়! প্রভিন্স ভেদে যা সর্বোচ্চ ৪৫০ ডলারে (৩০ হাজার টাকায়) গিয়ে ঠেকে। এমনকি এম্বুল্যান্স বাসায় এসে যদি দেখে ততক্ষনে আপনি সুস্থ, কোনো কথা নাই, ট্যাকা আপনাকে পরিশোধ করতেই হবে। কানাডিয়ান সেন্ট্রাল ইন্সুরেন্স এই ফি কভার করে না আর তাই নাগরিককেই এই ফি প্রদাণ করতে হয়। একটা রিসার্চে দেখে গেছে ১৯ শতাংশ কানাডিয়ান নাগরিক এই ফি’র ভয়ে এম্বুল্যান্স না ডেকে নিজ উদ্যোগে হাসপাতালে যাওয়ার কথা ভাবেন।

 

মৌলিক চাহিদা?

কানাডা মূলত বেশ ঠান্ডার দেশ সন্দেহ নেই। তবে ঠান্ডার সাথে যাতে আপনি লড়াই করতে পারেন সেই সুবিদার্থে প্রত্যেক বাসায় ঠান্ডা এবং গরম পানি সরবরাহ মৌলিক অধিকার। এমনকি বাসায় হিটিং সিস্টেম ইন্সটল এবং চালু রাখাও বাড়ীর মালিকের জন্য বাধ্যতামূলক।

 

শিক্ষা?

গ্রেড ১২ পর্যন্ত এই দেশে আপনার সন্তান বিনামূল্যে পড়াশোনা করতে পারবে যার পুরোটাই সরকার বহন করবে। উচ্চ শিক্ষার ব্যয় কিন্তু আবার আপনাকেই বহন করতে হবে। তবে এখানকার স্থানীয়দের মধ্যে গ্রেড ১২ পাশ করার পর পড়াশোনা চালিয়া যাওয়া বেশ দূর্লভ। গ্রেড ১২ পাশ করেই এরা কর্মস্থলে যোগদান করে। এদের একটা বড় অংশ আবার ট্রেড কোর্সে ভর্তি হয়ে যান। ট্রেড কোর্সের মাজেজা হল, ধরুন আপনি রাজ মিস্ত্রি হবেন, ইন্ডাস্টির কলকব্জা ঠিকঠাক করবেন, বাসা বা অফিসের বিদ্যুতের কাজ করবেন ইত্যাদি কাজের জন্য হাতে কলমে ক্লাস রুম এবং প্র্যাক্টিকাল এর দ্বারা দক্ষ রিসোর্সে আপনাকে পরিনত করবে আর অবশ্যই তার জন্য আপনাকে ফি দিতে হবে। ট্রেড কোর্স পাস করলে আপনি নূন্যতম মজুরীর চাইতে বেশী আয় করতে পারবেন। আর যারা উচ্চ শিক্ষা নিতে চান তাদের জন্যও আছে নানা সুযোগ সুবিধা। সব প্রভিন্স থেকেই আপনি এডুকেশন লোন নিয়ে পড়াশোনা করতে পারবেন। নামমাত্র সুদের এই লোন নিয়া আপনাকে বিন্দু মাত্র চিন্তা করতে হবে না। পাশ করার পর আপনাকে খুব অল্প টাকার ইন্সটলমেন্টে ধীরে ধীরে এই লোন শোধ করার সুযোগ দেয়া হবে। মজার ব্যাপার হলো আপনি শুধু চাকরী পেলেই হবে না, মোটামোটি ভালো সেলারি পাওয়া শুরু করলেই তখন আপনার থেকে টাকা কাটা শুরু করবে। উচ্চ শিক্ষার ব্যয় অনেক বেশী হলেও লোনের সুবিধা আপনার শিক্ষাজীবন সহজ করে তুলবে।

 

 

আবহাওয়া?

এখানকার আবহাওয়া মূলত ঠান্ডা। ব্রিটিশ কল্মবিয়া প্রভিন্স ছাড়া বাদ বাকি সব প্রভিন্সের শীতকাল ভয়াবহ। গড় তাপমাত্রা মাইনাস ২০ এর মতো থাকে তবে অনেক সময় তা মাইনাস ৩০-৫০ পর্যন্ত চলে যেতে পারে। স্নো স্ট্রোম হলে অনেক সময় রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায়, সিটির লোকজন যদিও খুব দ্রুতই রাস্তা রাস্তা থেকে স্নো পরিস্কার করে ফেলেন তার পরও অনেক সময় বলা হয় ঠান্ডায় ১৫ মিনিটের বেশী বাইরে না থাকতে। নিজের গাড়ী না থাকলে পাবলিক বাসে চলাফেরা বেশ কস্টকর তবে অসম্ভব না। এই ঠান্ডায় গাড়ীর পেট্রোল পর্যন্ত বরফ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে তাই মাইনাস ১০ হলেই প্রায় সব গাড়ীতে প্লাগ দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় যাতে পেট্রোল জমে না যায়।

বাতাস সাধারণত বিশুদ্ধ কিন্তু সিজনাল কিছু যন্ত্রানাও আছে। মূলত শুস্ক আবহাওয়ার কারণে এই মুল্লুকে ওয়াইল্ড ফায়ার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ক্যাম্প ফায়ার থেকে কিংবা ফেলে দেয়া সিগারেটের বাট আগুন লেকে মাইলের পর মেইল বন পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। এখানে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সুরক্ষিত রাখা হয় তাই কানাডায় মাইলের পর মাইল ঘন জঙ্গল। ওয়াইল্ড ফায়ার এতো দ্রুত ছড়িয়ে যায় যা কন্ট্রোল করা বেশ দুঃসাধ্য। ওয়াইল্ড ফায়ার কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ওয়াইল্ড ফায়ার দীর্ঘস্থায়ী হলে বাতাসে ধোঁয়া ছড়িয়ে পরে যা নিঃশ্বাসের সাথে শরীরে ঢুকে আনইজি সিচুয়েশন তৈরী করে।

 

পানি কি কিনে খেতে হয়?

নাহ! এখানে কল থেকে সরসরি বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যায়। গরম এবং ঠান্ডা পানি প্রতিটি কলে ম্যান্ডাটরি আর তাই পানি নিয়ে ভাবনার কোনো কারণও নেই। পানির ব্যাপারে কানাডা বেশ সফস্টিকেটেড। কিছু দিন পরপরই সিটির লোকজন রাস্তার বিভিন্ন পানির পাইপের সংযোগ থেকে স্যাম্পল পানি নিয়ে ল্যাবে ডায়াগোনোসিস করে যে পানি বিশুদ্ধ কিনা!

পানি নিয়ে ভাবনা আর না আর না! সেই দিন দেখলাম সিটি কর্পোরেশনের লোকজন রাস্তার পাশের আগাছা পরিষ্কার করছে। আমাদের মতো কাচি নিয়া ফটাফট একশন না! সিটির লোকেরা সাইজ মত মেশিন দিয়ে কাটে!

 

কিন্তু কাহিনী তো সবে শুরু!

কি যেন দেইখা হঠাত হার্ড ব্রেক, উস্তাদ গাড়ী থেকে নেমে দূরবীন নিয়া, ইয়ানি কি ম্যাগ্নিফাইন গ্লাস নিয়া আগাছায় আলাদিনের চেরাগ ঘুজতে লাগলেন! কিন্তু এই শীতের দেশের আরব্য রজনীর আলাদিন? উহু, ভাইসাব আগাছার মধ্যে এমন এক উদ্ভিদ পেয়েছেন যা আগে কখনো দেখেন নাই!

 

এখন?

কাটাকাটি বাদ দিয়া উস্তাদ "আন আইডেন্টিফাইড প্লান্ট" খুটি গেড়ে চলে গেলেন! কামে ফাকি দেও মিয়া? আমরা বুঝিনা! উহু, আমাদের ধারণা ভুল। এখন এখানকার উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ আসবেন। বলা তো যায় না, রাস্তার পাশে আগাছার মধ্যে মহামূল্যবান লতা গুল্ম লুকিয়ে আছে! উনার ক্লিয়ারেন্স ছাড়া জাস্টিন ট্রুডোর (কানাডার প্রাইম মিনিস্টার) বাপের ও সাধ্যি আগাছা কর্তন করা।

 

কানাডা মাইগ্রেশনের সুযোগ, প্রিপারেশন, প্রসেসিং । পর্ব ০১

পর্ব ০৩ঃ কানাডায় চাকুরী সমাচার?

পর্ব ০৪ঃ কানাডার লাইফ স্টাইল আর খরচাপাতি?