এমন অনুভূতি কখনো কি আপনার হয়েছে যে, সফলতার পথে আপনার চেষ্টাগুলো আপনাকে নিঃশেষ, ক্লান্ত এবং শূন্য করে দিচ্ছে? সাফল্য সম্পর্কে একেকজন মানুষের আইডিয়া একেক রকম, তবে এক জায়গায় তারা সবাই একমত- সেটা হল সাফল্যের জন্য চাই কঠোর পরিশ্রম।

 

কোনদিন হয়তো আপনি অনুপ্রেরণায় ডুবে থাকেন, আবার হয়তো ঠিক তার পরদিনই হতাশায় জড়িয়ে পড়েন- এমনটা কি ঘটেই চলছে? 

আপনি সবকিছু ঠিকঠাকই করছেন, তবে সমীকরণে সামান্য ভুল আছে। বেশিরভাগ দিনই আপনার এমন অনুভূতি হবে যে আপনি ঘর্ষণবিহীনভাবে চাকা ঘুরিয়েই চলছেন। আপনাকে জানতে হবে যে, সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানোর পথটা অনেক কঠিন। তাই বলছি, তিন কদম সামনে এগিয়ে, তারপর পিছলে অনেকখানি নীচে নেমে যাওয়ার অনুভূতির স্বাদ কখনো কি পেয়েছেন? 

 

সাফল্যের চাকা ঘোরানোর প্যাডেলে পা রাখলে এক সময় সেখানে পৌঁছে যাওয়া যাবে, তাই তো? সবসময়ই কিন্তু তা নয়। এমনকি যদি আপনি সাফল্য এনে দেয়া অভ্যাস গুলো রপ্ত করেও ফেলেন, তাও কিছু ছোটখাটো বিষয় ঠিকঠাক করতে না পারলে আপনার সমস্ত চেষ্টা বিফলে যাবে, আপনার শক্তি শুধু ক্ষয়‌ই হবে এবং হেরে যাওয়ার চক্রে আটকা পড়বেন।

চলুন জেনে আসা যাক কোন সেই ১০ টি ভুল যেগুলো আমাদের সফলতার পথে বাধা হয়ে আছে-

 

১. সব কাজকে সমান গুরুত্ব দেয়া 

৮০/২০ এর নিয়ম উৎপাদনশীলতার সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নিয়ম। এর মানে হল আপনার কাজের সেই ২০ ভাগ যা ৮০ ভাগ ফলাফল নির্ধারণ করে দিবে। তাই প্রতিদিনকার লক্ষ্য নির্ধারণ করার সময়, আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০ টি কাজ থেকে সেই দুটি কাজ আলাদা করে দেখে নিতে হবে যেগুলোর উপযোগ বাকি আটটি কাজের সম্মিলিত উপযোগের চেয়ে বেশি। 

এই নিয়মকে পাত্তা না দিলে, সামর্থের অধিকাংশ অংশ‌ই আপনি নষ্ট করে ফেলবেন কম উপযোগের কাজে। যে কারনে আপনার সামর্থ্য বা প্রতিভার সর্বোচ্চ ব্যবহার কখনোই করা হয়ে উঠবে না। 

 

২. সবাইকে "হ্যাঁ" বলা 

সবাই আপনার কাছেই আসে। আপনি বিষয়গুলো ভালো বোঝেন এবং জানেন কি ভাবে যে কোন কাজ করে ফেলা যায়। কিন্তু সীমানা ছাড়া এভাবে চালিয়ে গেলে, আপনি খুব দ্রুতই আপনার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবেন। তাই প্রত্যেকটি অনুরোধকে ভালো করে খতিয়ে দেখুন এবং আপনার লক্ষ্য ও প্রায়োরিটির সাথে মিলিয়ে দেখুন। যদি কোন সামঞ্জস্য খুঁজে না পান, তাহলে না বলুন। 

"পাগলামি এবং প্রতিভার মধ্যবর্তী দূরত্ব কেবলমাত্র সফলতা দিয়েই পরিমাপ করা যায়।" - ব্রুস ফেইরস্টাইন 

 

৩. বিস্তারিত বিবরণ না এড়িয়ে যাওয়া

আপনার কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা ফ্রিল্যান্সারদের মাইক্রোম‍্যানেজিং করা মানে কেবল সময় এবং শক্তি নষ্ট নয়, এটা তাদেরকে আরও বেশি করে ফলাফল অভিমুখী কাজের দিকে ধাবিত করবে, কিন্তু এটা তাদেরকে বিরক্ত‌ও করবে। আর বিরক্ত মানুষরা কখনো তাদের সেরা টা দিতে পারেন না। তাই তাদেরকে দেয়া আপনার প্রাথমিক সিদ্ধান্তে বিশ্বাস রাখুন এবং সেভাবেই কাজ বুঝিয়ে দিন। তাদের নিজেদের মত কাজ করতে দিন এবং নিজেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিবরণ থেকে চাপ মুক্ত রাখুন। 

 

৪. ফিনিশিং লাইনে পৌঁছানোর আগেই নিঃশেষ হয়ে যাওয়া 

আসা যাওয়ার পথে কিংবা এদিক ওদিক যেতে প্রচুর হাঁটছেন, আপনার জন্যই তো ভালোই হওয়ার কথা, তাই নয় কি? 

না। শরীর ক্ষয় আপনার লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে একটি বাস্তব হরর হুমকি। শরীরকে অবহেলা করলে কিংবা শরীর দিয়ে কিছু করে ফেলার চেষ্টা করলে শুধু শরীর ক্ষয়ই করবেন। তাই আপনার সময়সূচির মাঝে বিশ্রামের দিন যোগ করার চেষ্টা করুন, এবং নিজের শরীরকে নিঃশেষ হওয়া থেকে রক্ষা করতে কিছু হালকা ব্যায়াম‌ও যোগ করতে পারেন। 

সাফল্য আসতে সময় লাগে, এবং টেকসই কার্যকারিতার মাত্রা সাফল্যের ফিনিশিং লাইনে পৌঁছানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। 

 

৫. নতুন কিছুর জন্য খুবই ব্যস্ত হয়ে যাওয়া 

নিজের স্কিল বৃদ্ধি করতে কোন কোর্স এ যোগ দিতে চাচ্ছেন। যদিও এই মুহূর্তে আপনার হাতে সেমিনারে বসে কয়েকটি দিন কাটানোর মত সময় একেবারেই নেই। কিন্ত্ত আপনার কি এটা কখনো মনে হয়েছে যে, "আমি এটা ইতোমধ্যেই জানি" অথবা "এটা আমার জন্য প্রযোজ্য নয়"? সত্যি কথা বলতে, সফল ব্যক্তিরা এমন কখনো মনে করেন না। তাদের প্রবৃদ্ধির মানসিকতা থাকে এবং প্রতিটা দিন তারা খোলা মন নিয়েই বাস করেন, কাজগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে করার নতুন নতুন পথ খুঁজতে থাকেন, তাদের দিগন্তকে প্রসারিত এবং বৃদ্ধি করতে থাকেন। 

 

৬. বিকলপ এর বদলে বাধা তৈরি করা 

"আমি পারবো না" এবং "এটা অসম্ভব" এই কথাগুলো বলা অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করেছেন? সীমাবদ্ধতা উস্কে দেয়া এই বাক্যাংশ গুলো আপনার সফলতার পথে মানসিক বাধা তৈরি করে। আরো জঘন্য ব্যাপার হল অন্যরা আপনাকে হতাশাবাদী এবং অযৌক্তিক মনে করতে থাকবে। তাই কঠিন কোন অবস্থায় পড়লে নিজের শক্তির দিকটিতে নজর দিন এবং সেটাকে ঘিরেই পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। বিকল্প চিন্তা ভাবনা এবং শব্দগুচ্ছ , যেমন, "আমি যা করতে পারি তা হলো....." এবং "আচ্ছা বরং এটা চেষ্টা করি...", ব্যবহার করে আপনার ব্রেইনকে পুনঃ প্রশিক্ষণ দিন। 

 

৭. অস্পষ্ট লক্ষ্যের পেছনে ছোটা 

সাফল্য এনে দেয়া লক্ষ্যগুলো হয় সুনির্দিষ্ট এবং পরিমাপ উপযোগী। অন্যদিকে অস্পষ্ট লক্ষ্যগুলো অর্জন করা অসম্ভব, তাই এগুলো দিয়ে কিছুই হবে না শুধু আত্মবিশ্বাস আর অনুপ্রেরণা ক্ষয় হবে। 

আপনার লক্ষ্যগুলোকে পরিকল্পনায় পরিণত করে দীর্ঘসূত্রিতা এড়িয়ে চলুন। এগুলোকে ছোটছোট পদক্ষেপে ভাগ করে নিন এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাজান। অতঃপর ৮০/২০ এর নিয়ম প্রয়োগ করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শুরু করুন। 

"আপনি যদি উৎকর্ষ অর্জন করতে চান, তবে আজই সেখানে পৌঁছতে পারবেন। এই মুহূর্তেই, যে কাজটি উৎকর্ষতা পূর্ণ নয় সেটি করা ছেড়ে দিন।" - টমাস জে. ওয়াটসন

 

৮. নেতিবাচকতায় ডুবে যাওয়া 

আমাদের সবারই পরিচিত এমন একজন মানুষ আছে। যখনই আপনি তার মুখোমুখি হন সে আপনার শক্তিগুলোকে নিঃশেষ করে দেয়। প্যাসিভরা শান্তভাবে আপনার প্রোডাকটিভিটিকে ব্যাহত করে। আর আক্রমণাত্মকরা আপনার অনুপ্রেরণা কে কুচি কুচি করে ফেলে। তাই এদের সম্পর্কে সতর্ক থাকুন, কারণ এরা আপনাকে তাদের সাথে নিচের দিকেই নিয়ে যাবে। তাদের সাথে সাক্ষাত কমিয়ে দিয়ে, ফোনের বদলে ইমেইল করে এবং তাদের প্রয়োজনীয় "নেতিবাচক ক্যাচাপ" ভদ্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে তাদের নেতিবাচক ক্ষেত্র এড়িয়ে চলুন। 

 

৯. ব্লেইম গেম খেলা 

কেউই নিখুঁত নয়। এমনকি পেশাদাররাও ভুল করে থাকেন। পার্থক্যটা হলো তারা জানেন ভুলের মাঝে কত ধন লুকিয়ে থাকে এবং তারা ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। 

ব্যর্থতা পুনরায় একই পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য মস্তিষ্ককে তৈরি করে রাখে। যখন কোন কিছু ভুল হয়ে যায় মন খোলা রেখে আপনার ভূমিকা চিন্তা করুন, দেখবেন এই রুপালি আস্তরণের সন্ধান পেয়ে যাবেন, এটা অবশ্যই সেখানে আছে।

 

১০. আগামীকালকে সপ্তাহের সবচেয়ে ব্যস্ত দিন বানিয়ে নেয়া 

এটা সপ্তাহের এমন একটি দিন যে দিনে প্রায় সবকিছুই আছে। যে কাজ আপনি আজ করতে পারলেন না তাই পাঠিয়ে দিচ্ছেন আগামীকালে। আসলে যে কোন বাধা অতিক্রম করার জন্য সবচেয়ে কম আকর্ষণীয় কাজ এটা। অনুধাবন করুন, আজকের কাজটি আগামীকালের দিকে ঠেলে দিয়ে সফলতার পথে আরেকটি দিন পিছিয়ে যাচ্ছেন। শুরু করার সবচেয়ে ভালো দিন আজ‌ই। এমনকি যদি আপনি খুব সামান্য একটি পদক্ষেপ‌ও নিয়ে থাকেন, তবে আপনি আপনার লক্ষ্যের পথে একটি ধাপ এগিয়ে গেলেন। 

এই ভুলগুলো শুধরে ফেলুন এবং সাফল্যের পথটি আরো স্পষ্ট করে ফেলুন। 

আপনি নিজেকে কখনো এ ধরনের কোন ব্যবহারে আবিষ্কার করেছেন? অবচেতনে প্যানিক এর কারনে আঙ্গুলের নখ কামড়ানো শুরু করে দিয়েছেন? চিন্তা করবেন না- সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। 

এখন যেহেতু আপনি যে ভুলগুলো করছিলেন সেগুলো সম্পর্কে সচেতন, তাই কয়েক মুহূর্ত আগের চেয়ে এখন আপনি অনেকখানি এগিয়ে আছেন। 

 

এখন যেহেতু যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলো আপনাকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তাদের সম্পর্কে জেনেই গেলেন, তাই সময় এখন ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে যাওয়ার । এই ভুল গুলোর মাঝে কোনটি আজও আপনি করেছেন এবং এই ভুলগুলো শুধরাতে কি করতে চান? আপনাদের মতামত জানিয়ে দিন কমেন্টে..

 

সুত্রঃ অ‍্যাডিকটেড টু সাকসেস অবলম্বনে