সবিনয় নিবেদন এই যে, ইদানিং জেনারেল সাহেবের সংখ্যা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের সমর উন্নয়নের প্রেক্ষিত ও বাস্তবতা নিম্নে তুলিয়া ধরিতেছি।

আমাদের ডেস্ট্রয়ার নাই, এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার দরকার। সরকার হেলি ক্যারিয়ার কেনে না কেনো? লং রেঞ্জ এয়ার ডিফেন্স নাই কেনো? বার্মা নিজেরা ফ্রিগেট বানায় আমরা পারিনা কেনো? পাকিস্তানের পরমাণু আছে আমাদের নাই কেনো? এরকম অজস্র প্রশ্নের তীরে বিদ্ধ হয়ে আমাদের বাস্তবতার আলোকে নিচের লেখাটা। পুরটা পড়বেন। মতামত দিবেন।

 

জিরো টাকা রিজার্ভ দিয়ে এই দেশের যাত্রা শুরু। অবকাঠামোর কিছু অবশিষ্ট ছিল না। সেখান থেকেই পথ চলা তলাবিহীন ঝুড়ির খেতাব পাওয়া এই দেশটি। সামরিক বাহীনির যাত্রা শুরু পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া অল্প কিছু সরঞ্জাম, সোভিয়েতের দেওয়া এম আই -৮ হেলিকপটার, চা এর বিনিময়ে মিশরের আনোয়ার সাদাদের পক্ষ থেকে গিফট পাওয়া ৩০ টা ট্যাংক দিয়ে।

 

এরপর ও ১৯৭৪ সালের আগষ্টে ওই আমলেই ফ্রিগেট কেনার চুক্তি করে সরকার। ১৯৭৫ সালে মুজিব হত্যার পর থেকে ২০০৯ অনেক লম্বা সময়। এই সময়ে আহামরি কোন সামরিক উন্নয়নের ছোয়া বাংলাদেশ দেখেনি। হ্যা এরশাদের আমলে কিছু এফ-৭ এমবি এয়ার গার্ড কেনা হয়েছিল। এরপর মিগ-২৯, বিমান ক্রয়, বাংলাদেশের প্রথম ব্রান্ড নিউ উলসান ক্লাসের ফ্রিগেট, আর বেগম খালেদা জিয়ার আমলে ১৬ টা এফ-৭ বিজি কেনা পর্যন্তই। এরপর দীর্ঘ বিরতি। পরিকল্পনা হীন খাপছাড়া ক্রয়।

 

২০০৯ এ ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর আগে সুপরিকল্পিত কোন ক্রয় হয়নি। বিশ্বাস করা কঠিন, ২০০৯ এর আগে ছিল না কোন ভাল রাডার সিস্টেম। শত্রুর উপর নজরদারির জন্য বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হতো অতি প্রাচীন রাডারের উপর।  প্রথম দূর্বলতা আমাদের রাডার সিস্টেম। শত্রুর উপর নজরদারি যদি করতে না পারি, চোখ ফাকি দিয়ে বিনা বাধায় মিশন কমপ্লিট করে চলে যাবে আমাদের প্রতিবেশিরা।

এই দূর্বলতা  কাটাতে শুরুতেই নজর দেওয়া হল ভাল রাডার সিস্টেমের উপর। আগে শত্রুকে ট্রেস করার ক্ষমতা সবচেয়ে জরুরি। ২০০৯ এর পর পরিকল্পনা মাফিক আমাদের আকাশে সর্বক্ষন নজরদারির জন্য ২০১১ তে আমরা ওয়াই YLC-2A AESA রাডার যুক্ত করা হয়। একি সাথে ২০১৩ থেকে ২০১৫ এর ভেতর কিনে ফেলা হল JH16B, JY-11B রাডার। আর সর্বাধুনিক রাডার হিসাবে ইতালির লিউনার্ডোর তৈরি SALEX RAT-31DL L ব্যান্ডের রাডারের অর্ডার দেওয়া হল, যেন বাংলার আকশে স্টিলথ বিমান নিয়ে ঢুকলেও সেটা আমাদের নজরদারির বাইরে না থাকে। মোটামুটি রাডার নিয়ে দুশ্চিন্তা কমল আমাদের।

 

Picture collected from internetPicture collected from internet

 

এরপর আসি এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম নিয়ে। যেহেতু এটা খরচ সাপেক্ষ পথ। কিন্তু চুপ করে বসে থাকলে কী চলবে? বিশ্বাস হোক আর না হোক স্বাধীনতার পর এত গুলি বছর পার হয়ে গেছে এয়ার ডিফেন্সে কেউ কোন উন্নতির চিন্তা করেনি। ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত আমাদের ভরসা ছিল মানুষ নিয়ন্ত্রিত ম্যানুয়াল এডি গান। হ্যা। ঠিক শুনছেন। ২০১৩ এর আগ পর্যন্ত লোহার গোল চাকতিতে চোখ বুলিয়ে আকাশের দিকে নিরিখ করে গুলি ছূড়ে পাখি মারার মত অবস্থা ছিল আমাদের। এখানে আমাদের প্রয়োজন কে গুরুত্ন্ব দিতে হবে। এয়ার ডিফেন্সের কিছু উদ্দেশ্য থাকে। কোন স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য সল্প পাল্লার পয়েন্ট ডিফেন্স সিস্টেম লাগে। এর উপরে গেলে মধ্যম পাল্লা, তারপর আছে দূর পাল্লার। অনেকেই বলেন দূর পাল্লার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম নাই কেন। ভাই, নিরাপত্তার কথা চিন্তা করলে ফ্যান্সি ওয়েপনের থেকে প্রয়োজনীয় ওয়েপন টা আগে আনা কী বুদ্ধিমানের কাজ নয়? এজন্যই ২০১২-১৩ তে আনা হল FM-90, সাথে ম্যানপ্যাড। ম্যানপ্যাডের টেকনলজি নেওয়া হল। সাথে যুক্ত হল সর্বাধুনিক অরিলিকন জিডিএফ-০০৯। ক্রমান্বয়ে এগুলার সংখ্যা বাড়ানো হল। এরপর আমাদের প্রয়োজন পড়ল মধ্যম পাল্লার এয়ার ডিফেন্সের। যা হয়ত আগামি বছর চলে আসবে। LY-80D হবার সম্ভাবনাই বেশি। আর এর থেকে বেশি রেঞ্জের ডিফেন্স সিস্টেমের জন্য ইভ্যালুয়েশন চলতেছে। তাই বুঝতেই পারতেছেন খুব সুচিন্তিত ভাবেই আমাদের ঘাটতি গুলাকে চিনহিত করে সেভাবেই মেটানো হচ্ছে।

 

এরপর আসি আর্টিলারি প্রসংগে। কোন যুদ্ধে জয় এনে দেবার মক্ষম নিয়ামক এই আর্টিলারি। এখানেও ভাইসকল, কষ্টের সাথে জানাচ্ছি আমাদের কাছে ২০১৩ এর আগে কোন সেল্ফ প্রোপেলড আর্টিলারি ছিল না। এই ভয়ানক দূর্বলতাকে কাটাতে যোগ করা হল ১৮ টা নোরা বি-৫২ কে। একি সাথে এই সময়ের আগে আমাদের কোন GMLRS ছিল না। যুক্ত করা হল WS-22 কে। এসবের আগে আমাদের একমাত্র ভরসা ছিল কিছু টাইপ-৯০ MLRS আর টোউড আর্টিলারি। সেল্ফ প্রপেল্ড আর্টিলারির সংখ্যাও আস্তে আস্তে বাড়ানো হচ্ছে। মানে, আমাদের আরেকটি বড় দূর্বলতার জায়গাটা কিছুটা হলেও পুরন করা গেছে।

 

এন্টি ট্যাংক মিসাইলের ক্ষেত্রে ভরসা ছিল বখতার শিখান। যার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিবেশিদের ট্যাংক আক্রমন প্রতিহত করবার জন্য আধুনিক কিছুই যুক্ত হয়নি এত গুলা বছরে। এই ঘাটতি কাটাতে যুক্ত করা হল মেটিস এম, আরপিজি-২৯ এর আধুনিক ভার্সন আরপিজি-৩৯। এই দুইটা যুক্ত করার পর একটু হলেও নিশ্চিন্তে থাকা যাবে। কোন ট্যাংক অন্তত এদের ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করতে দেশের মাটিতে পা রাখার আগে দ্বিতীয় বার ভাববে। এখানেও বলে রাখি এটা ছিল আমাদের প্রায়োরিটি। ফ্যান্সি ওয়েপন পরে। আগে নিজেদের ঘাটতি মেটানো জরুরি। ৩৫ বছরের অবহেলিত একটা বাহীনিকে এসব বেসিক জিনিস দিয়েই আগে দাড় করিয়ে তারপর ফ্যান্সি ওয়েপনের দিকে যেতে হবে।

 

Picture collected from internetPicture collected from internet

 

নেভীর কথায় আসা যাক। আমরা দেখেছি নেভীকে সব থেকে বেশি প্রায়রিটি দেওয়া হচ্ছে। এটা নিয়ে আলোচনা অনেক বড় হবে। সংক্ষেপে। আনন্দ শীপইয়ার্ড যখন স্টেলা মেরি জাহাজ বানায়ে রপ্তানি করল এর আগে আমরা জানতাম না আমরাও পারি জাহাজ বানাতে। বেশিদিন আগের কথা না। তবে যুদ্ধ জাহাজ? না। এত বছরে কেউ চেষ্টাও করেনি। অবশেষে বাংলাদেশ নেভী সেটা প্রমাণ করল পেট্রল ভেসেল দেশে বানিয়ে। এরপর এলপিসি, সাবমেরিন টাগবোট। কিন্তু সক্ষমতা সংকটের জন্য নতুন ইয়ার্ড বানানো জরুরি হয়ে পড়ল। সাথে সাথে সিডিডিএল এর প্রকল্প শুরু। ফ্রিগেট কর্ভেট ও এখন দেশে বানানো হবে। মাত্র ৫ বছর আগের সাথেই এখনকার অবস্থা তুলনা করেন নিজেই বুঝবেন। তাই এখন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার কেন নাই এসব স্বপ্ন বাদ দেন। আমরা কম দূরত্ব অতিক্রম করিনি এই অল্প সময়ে। একি সময়ে ২০১৬ এর শেষে মিং ক্লাস সাবমেরিন দিয়ে আমরা আন্ডার ওয়াটার ক্যাপাবিলিটি অর্জন করেছি যা প্রতিবেশি দেশ গুলাকে ভুগাচ্ছে। একি সাথে এই সময়ে আমরা নেভাল এভিয়েশন চালু করেছি। ড্রনিয়ার, অগস্টা ওয়েস্টল্যানড হেলি কিনতে পারছি। অটোম্যাট এর মত বিখ্যাত মিসাইল বহরে যুক্ত করতে পেরেছি। ভবিষ্যত প্লান না হয় বাদ দিলাম। এত দ্রুত আমাদের দূর্বলতা এভাবে কাটবে এটার জন্য শুকরিয়া করা উচিত। ফ্রিগেট তো আরো আসতেছে। কোস্ট গার্ডের ছোট বোটের বদলে মিনারভা ক্লাস আনতে পেরেছি আমরা।

 

বিমান বাহীনি নিয়ে আক্ষেপের শেষ নাই। ইয়াক আসল। ৩ তা হারালাম। কে-৮, আর মাল্টিরোল টেন্ডার ছাড়া কিছুই বলার নাই। তবে যেহেতু এটা সবথেকে খরচ সাপেক্ষ। নেভি একটু দাঁড়িয়ে গেলে এরপর বিমান বাহীনির উপর নজর দিবে সেই আশা করাই যায়।

 

তবে বঙ্গবন্ধু এরোনটিকাল সেন্টার করা হইছে, যেখানে এফ-৭ এর মত বিমানকে নিজেদের দেশেই ওভারহলিং করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে ট্রেইনার জেট বানানোর ও পরিকল্পনা রয়েছে এখানে ।

 

সার্বিক ভাবে সিলেটে, রামুতে নতুন ব্রিগেড করা হয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট করা হয়েছে অনেক গুলা। নতুন নেভাল বেজ, এয়ার বেজ সহ মোটামুটি যা করা হয়েছে তাতে ফোর্সেস গোল -২০৩০ নিয়ে তাচ্ছিল্য করবার আগে একটু মাথা খাঠানো উচিত বলে মনে করি।

 

চীন - বাংলাদেশ সম্পর্কঃ মিগ-২৯ এবং ফ্লাগশিপ উলসান ক্লাস ফ্রিগেট

পাকিস্তানকে টপকে সাউথ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি হতে চলেছে বাংলাদেশ

পশ্চিম বঙ্গ নাকি বাংলাদেশ??? অর্থনৈতিক ভাবে কারা বেশি এগিয়ে?

ভারতের উপর কতটুকু নির্ভরশীল বাংলাদেশ?

পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের উত্থান, আরাকানের স্বাধীনতা