বাংলাদেশে এতদিন মাত্র দুইটি সমুদ্র বন্দর ছিল। মংলা আর চট্টগ্রাম। মংলার পশুর চ্যনেলে গভীরতা মাত্র ৭-৮  মিটার ড্রটের ভেসেল ঢুকার জন্য উপযুক্ত। সল্প গভীরতার কারনে বড় ভেসেল গুলা ভীড়তে পারে না। 

 

এতদিন চট্টগ্রাম বন্দর ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু বন্দর চ্যানেলের গভীরতা সর্বোচ্চ ৯.৫ মিটার এর বেশি ড্রটের  ভীড়তে পারে না। বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানি  বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত চাপ নেবার মত ক্ষমতা দুই বন্দরের কোনটিরই নাই। 

 

এর পর কন্টেইনারের প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে বেড়ে চলেছে। স্বাধীনতার পর কোন সরকারকে এই বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত মনে হয়নি। 

মন্দের ভাল এই যে অবশেষে একটা গভীর বন্দরের জন্য কাজ শুরু করে সরকার। জায়গা নির্ধারন নিয়ে অনেক নাটক হয়। প্রথমে আকরাম পয়েন্টে, কখনো বলা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের অউটার এংকরেজে করা হবে। শেষমেস নির্ধারন হয় সোনাদিয়া। 

সোনাদিয়ায় হবার জন্য অনেকেই খুশি। কিন্তু বেশ কিছু কারণে সোনাদিয়ায় হবেনা বলেই ধরে নেওয়া যায়। সেটা অন্য পোস্টে বলেছি। 

 

হুট করে উদয় হল পায়রা বন্দরের। দক্ষিণাঞ্চলে বন্দর করা নিয়ে যে সব প্রতিক্রিয়া দেখতেছি ইদানিং তাতে মনে হচ্ছে খুব বড় একটা ভুল করছে সরকার। যেহেতু $১৬ বিলিয়ন বা ১২৫০০০ কোটি টাকার প্রকল্প তাই এত টাকা এখনে নষ্ট করতে অনেকেই নারাজ। তাদের কাছে মনে হইছে এটাও আরেকটা সমুদ্র বন্দুরের নামে নদী বন্দর হতে যাচ্ছে। 

 

অনেকে দেখতেছি পাকিস্তানের গোয়াধর বন্দরের উদাহরন টানতেছে। তাই আলোচনার আগে কিছু জিনিস বুঝে নেয়া যাক।

নরমাল বন্দরের জন্য চ্যানেলের গভীরতা ২০ ফিটের বেশি হতে হয়। গভীর বন্দরের জন্য সেটা ৩৩ ফিট বা আরো বেশি। 

পাকিস্তানের গোয়াধরে যে বন্দর হচ্ছে সেটা ১৪ মিটার ড্রটের ভেসেল ভীড়াতে সক্ষম। প্রায় ৩২ কিমি পর্যন্ত টার্মিনাল করা সম্ভব। আমাদের পায়রা কি তাইলে সেটা পারবে???

ভাই সকল, বেলজিয়ামের সাথে পায়রা বন্দরের অন্যতম প্রধান কাজ ড্রেজিং এর চুক্তি সম্পাদন হইছে। ২০২০ সাল নাগাদ পায়রা প্রায় ১১ মিটার গভীরতায় ভেসেল ভীড়াতে সক্ষম হবে। যা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অনেক বেশি। এটা শুধু ড্রেজিং এর প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ধাপে ২০২২ সাল নাগাদ এখানে ১৪ মিটার গভিরতার ভেসেল ভেড়ানোর মত করে চ্যানেলকে প্রস্তুত কর হবে। তাইলে বলেন, এটাকি গভীর সমুদ্র বন্দর বলা যায়??

 

পায়র বন্দরের অবস্থান এমন জায়গায় যেখানে নদীর প্রশস্ততা প্রায় ৪ কিমি। হ্যা ভাই। পুরা ৪ কিমি। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী সমুদ্রের দিকে টানা ১১ কিলোমিটারের টার্মিনাল করা হবে। নিচের ছবিটা দেখলে বুঝবেন আশাকরি। 

 

এখন প্রশ্ন পায়রায় করে লাভটা কী? 

ভাই, আমদের অর্থনীতিতে দেশের সব অংশের সম্ভাবনা অনুযায়ী অবদান ঠিক আছে, দক্ষিন অঞ্চল ছাড়া। বাংলাদেশের ৭০০ কিমি এর বেশি উপকুলের বেশির ভাগ অংশই কিন্তু এই দক্ষিন অঞ্চলে। অথচ যোগাযোগ আর অবকাঠামোর ঘাটতির কারনে দেশের অর্থনিতিতে তাদের অংশ সীমিত। সম্ভাবনা প্রচুর। কিন্তু কাজে লাগানোর ব্যাবস্থা কেউ করেনি। 

 

চট্টগ্রাম নির্ভর হবার কারনে আমদানি রপ্তানির জন্য ঢাকা চিটাগং হাইওয়েই একমাত্র ভরসা ছিল। কোন বিকপ্ল ছিল না। সোনাদিয়া বন্দর করলে এই হাইওয়ের উপর ই বেশি প্রেশার পড়ত। যেহেতু দেশের বিকল্প রুট নায়। 

 

 

পায়রা বন্দর সেখানে বিকল্প সমাধানের পথ এনে দিয়েছে। সড়ক ও রেল নির্মান হলে পায়র বন্দর থেকে ঢাকার অবস্থান,  চট্টগ্রম বন্দরের অবস্থান থেকে আরো কম হবে। ফলে দ্রুত পন্য পরিবহন হবে। লিড টাইম কমে আসবে। 

কোন কারনে ঢাকা চিটাগং রোডে ঝামেলা হলে বিকল্প হিসাবে আরেকটি দরজা খুলে দিবে পায়রা। আর এই বন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠবে দক্ষিনাঞ্চলে বিভিন্ন অবকাঠামো। শুধু তাই নয়। এই বন্দরকে ঘিরে অবকাঠামো গড়ে উঠার জন্যই দক্ষিণাঞ্চলে ৩১ তম সেনানিবাস করা সম্ভব হয়েছে। এই সেনানিবাস করার জন্য দীর্ঘদিনের অরক্ষিত এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে। এই অঞ্চলের ১৯ জেলার নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব ছিল যশোর সেনানিবাসের। তাদের উপর প্রেশার কমবে। দূর্যোগকালীন সময়ে দ্রুত রেস্পন্স করা সম্ভব হবে। বলা যায় এই সব কিছুই শুধু এই একটি বন্দরকে ঘিরেই। 

 

তাই ভাই হতাশ না হয়ে ব্রাইট সাইড টা দেখার চেষ্টা করুন। পাকিস্থানের গোয়াধর যদি ১৪ মিটার গভিরতার ভেসেল ঢুকার ব্যাবস্থা করে আপনাদের কাছে গভীর সমুদ্রবন্দরের খেতাব পায় তবে পায়রাকে কেন সেই খেতাব দিবেন না? এর গভিরতাও একই।