শুরুটা করি এভাবে, অনেকেই আছে যারা শুনেছেন স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাংলাদেশের জন্য বিশাল সুবিধা আনবে। কিন্তু সত্য হল অত গভীরভাবে বিশ্লেষন করে এখনো বুঝে উঠতে পারেননি ঠিক কি রকম সুবিধা আনবে এই সেতু। শুধুমাত্র একটা সেতু কি করে জিডিপি ১.২% বৃদ্ধি করতে পারে?? ১.২% বৃদ্ধি চারটি খানি কথা না। 

 

$২৫০ বিলিয়নের জিডিপি এর ১.২% প্রায় $৩ বিলিয়ন ডলার, যা কিনা প্রতিবছর জিডিপির আকারের সাথে সাথে সমানুপাতিক হারেই বাড়বে।   ফলে আমাদের প্রতিবেশি বন্ধুপ্রতিম(!) দেশ বার্মার ২০১৭ সালের সামরিক বাজেট $২.১৪ বিলিয়নের  থেকে বেশি ফল আসবে এই পদ্মা সেতু থেকে। কিন্তু কিভাবে সেটা সম্ভব?? এটা তো শুধু মাত্র একটা সেতু তাইনা?? ঠিক এই বিষয়ে একটু আলোচনা করব। ধৈর্য্য ধরে পুরটা পড়ুন। 

 

এক নজরে দেখে নেই ঠিক কি কি সুবিধা দিবে এই সেতু। 

 

১. পদ্মা সেতু জোড়াতালি দেওয়া ৪১ টি স্পানের  ৬.১৫ কিমি দীর্ঘ দোতলা একটা সেতু। সেতুর মূল নকশা অনুযায়ি প্রথমে একতলা সড়ক সেতু করবার কথা ছিল আর খরচ ছিল ১০ হাজার কোটি। পরে রেল যোগাযোগের গুরুত্ব বুঝতে পেরে এটাকে রেল ও সড়ক উভয় সেতু করার জন্য সমন্বিত নকশা প্রস্তুত করা হয়। এক তলা সেতু হয়ে যায় দোতলা। খরচ বেড়ে যায় দ্বিগুন। সাথে নদী শাসন, সংযোগ সড়ক, সার্ভিস এরিয়ে সব মিলিয়ে সেটা এখন ৩০ হাজার কোটি। শুধু সড়ক সেতু করলে ৭০-৮০ টন ওজন নিতে পারে এরকম ব্রিজ করলেই যথেষ্ঠ ছিল। যেহেতু রেল যুক্ত করা হয়েছে তাই একে আরো বেশি ভার বহন করতে হবে। ফলে পাইল গুলা আরো বেশি গভীরে ঢুকাতে হবে। লোড নেবার ক্ষমতা করতে হবে ২৪০০ টন। সেভাবেই নকশা। 

 

২. দক্ষিন অঞ্চলের ২১ জেলার সাথে দূরত্ব কমাবে ১০০  থেকে ১৫০ কিমি পর্যন্ত। এর ফলে সময় বেচে যাবে প্রায় ৩-৪ ঘন্টা। 

 

৩. এই সেতুকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান হবে। আর সরাসরি উপকৃত হবে প্রায় ৩০ মিলিয়ন বা ৩ কোটি মানুষ। 

 

৪. এডিবি এর হিসাব অনুযায়ি জাতীয় এবং আঞ্চলিক ভাবে বিনিয়োগ অনেক গুন বাড়বে। শিল্প, অবকাঠামো খাতে অভাবনীয়  প্রভাব ফেলবে। ফিনানশিয়াল ইনক্লুসনের আওতায় আসবে কোটি মানুষ। 

এত এত গল্প শুনার পরো হয়ত ভাবছেন কীভাবে এরকম করবে সেই কাহিনী বুঝলাম না। সেটা বুঝার জন্য চলুন মূল আলোচনায় যাওয়া যাক। 

 

সংগ্রীহিত সংগ্রীহিত

 

কোপেনহেগেন কন্সেন্সাস সেন্টার নামে একটা প্রতিষ্ঠান আছে, যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে ঠিক কি পরিমাণ  আর্থ-সামাজিক বেনিফিট আসে সেটার উপর গবেষণা  করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী  এই প্রকল্পে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগে ২ টাকার বেশি আর্থ-সামাজিক উপকার আসবে। তাদের হিসাব অনুযায়ী  সেতু চালু হবার পর প্রথম ৩১ বছরে যে পরিমাণ প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে সেটাকে টাকায় রুপান্তর করলে ১৩০০০০ কোটি বা ১.৩ ট্রিলিয়ন টাকার সমান। কিন্তু তারা যেহেতু পায়রা বন্দর কে হিসাবে আনেনি। তাই এই আর্থিক অবদান যে এই ১.৩ ট্রিলিয়ন থেকেও বেশি হবে সেটা না বুঝার কিছু নাই।

 

তাদের গবেষণার সময় তারা শুধু মংলা এবং বেনাপোল বন্দরকে হিসাবে এনেছে। পায়রা বন্দর তাদের হিসাবে ছিল না কারন এটা পরে করা হইছে। 

একটা গল্প বলি, না হলে আমি আপনাদের ঠিক ভাবে বুঝাতে পারব না। 

 

ধরুন আপনি একজন পরিবহন ব্যাবসায়ী। আপনার ৫ টা ট্রাক আছে। প্রতিটা ট্রাক আপনি ভাড়া দিয়েছেন ১০০০০ টাকা করে মোট ৫০০০০ টাকায়। আপনার ট্রাক যে ভাড়া নিয়েছে সে বেনাপোল থেকে কোন পন্য ঢাকা নিয়ে যাবে। যদিও ভাড়া হবার কথা ৪০০০ টাকা, কিন্ত সে ১০০০০ টাকায় ভাড়া নিয়েছে কারন বেনাপোল থেকে পণ্য বোঝায় ট্রাকটি ঢাকায় পৌছাতে প্রায় ১.৫ থেকে ২ দিন এর মত লাগে। ফেরি ঘাটে সিরিয়াল ধরে দাঁড়িয়ে থেকে ফেরি পাইলে তারপর সেটা ঢাকায় আসবে। 

 

 

ঈদ বা অন্য কারনে ঘাটে জ্যাম থাকলে আরো বেশি সময় লাগবে। ট্রাক তার পণ্য ঢাকায় নামিয়ে ফিরে আসতে প্রায় আরো একদিন এর বেশি সময় নষ্ট হবে। একারনেই আপনি ১০০০০ টাকা চাইলেও ব্যাবসায়ি আপনার কথায় রাজি। কারন একবার ভাড়া দিলে আর আগামি ৩ দিনের মধ্যে ভাড়া দেওয়া সম্ভব না। 

 

কিন্তু যদি পদ্মা সেতু হয় তাইলে সকাল বেলা বেনাপোল থেক ছেড়ে আসা ট্রাক দুপুরে ঢাকা পৌছাবে। মাল খালাস করে অন্য কাউকে ভাড়া দেবার উপযোগি হবে। ফলে আপনি এই ৩ দিনে চাইলে ৪-৫ জনকে ভাড়া দিতে পারবেন যেখানে আপনি আগে মাত্র ১ জনকে ভাড়া দিতে পারতেন। এজন্য আপনি যদি ভাড়া ১০০০০ হাজারের জায়গায় ৫০০০ করেন সেক্ষেত্রেও ওই একি সময়ে আপনি ট্রাক থেকে প্রায় ২০-২৫ হাজার টাকা আয় করতে পারবেন। আর ভাড়াও যেহেতু ১০০০০ থেকে কমে ৫০০০ হয়েছে ফলে পণ্যের পরিবহন খরচ ও কমে যাবে। এর প্রভাব পড়বে বাজারে। জিনিসপত্রের দাম কমে আসবে। মার্কেটে পণ্যের ঘাটতি থাকলে দ্রুত আয়ত্বে আনা যাবে। ঠিক এরকম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনেক ক্ষেত্রেই এটা জনজীবনে প্রভাব ফেলতে সক্ষম। 

 

আরেকটা দিক দেখি। আপনার ট্রাকটির ৩ দিনে যেখানে একবার মাল খালাস করার মত ক্ষমতা ছিল সেই একটা ট্রাক দিয়েই আপনি একই সময়ে ৪-৫ বার ভাড়া দিতে পারবেন। মানে একটা ট্রাক থেকেই আপনার  পণ্য পরিবহনে প্রায় ৪-৫ গুন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেল। বর্তমানে যে পরিমাণ পন্য পরিবহনে ২০০০০ ট্রাক প্রয়োজন পড়ত সেখানে ৫০০০ হাজার ট্রাক দিয়েয় ২০০০০ ট্রাকের মালামাল পরিবহনের মত ক্ষমতা থাকবে শুধু লিড টাইম কমে যাবার ফলে। যেটা আপনার আয় বাড়াবে সাথে এই সংশ্লিষ্ট অন্যদের আয় ও বাড়াবে। 

এটা শুধু একটা উদাহরণ। প্রতিটা খাতেই ঠিক একি ভাবে এর প্রভাব পড়তে থাকবে। এক যমুনা সেতু দিয়ে উত্তরাঞ্চলের দারিদ্রতার হার ৯০ ভাগ থেকে কমিয়ে ৪০ ভাগের নিচে  আনা সম্ভব হয়েছে। যদিও কিছু জেলায় (যেমন কুড়িগ্রাম) এই হার এখনো ৫৫ ভাগের উপরে। 

 

আর যেহেতু এটার সাথে পায়রা বন্দরের সংযোগ থাকবে তাই রেলে বা সড়কে খুব সহজে এবং দ্রুত পণ্য ঢাকা পৌছাতে পারবে। পায়রা বন্দর ব্যাবহার করে প্রচুর পণ্য সড়ক ও রেলপথ ধরে দ্রুত সারা দেশে পৌছানো সম্ভব হবে। 

মানি সারকুলেসন যত বেশি হয় জিডিপি তত বাড়ে।  যখন লেনদেনে গতি আসে সেটার প্রভাব সরাসরি ইকোনমিতে পড়ে। রেল সংযোগের ফলে পরিবহন খরচ অনেক কমে যাবে। মার্কেট ম্যানুপুলেসন কমে যাবে। 

 

আমাদের দেশে বিনিয়োগে সব থেকে বড় বাধা অবকাঠামো। দক্ষিনাঞ্চলের ২১ জেলা বলতে গেলে বিচ্ছিন্ন ছিল। এই সেতুর ফলে সরাসরি সড়ক এবং প্রথমবারের মত এই অঞ্চলের জেলার সাথে বিশেষ করে বরিশাল জোনে রেল যোগাযোগ স্থাপন হবে। আর পণ্য রেলে বহন করলে খরচ অনেক কমে যায়। তার প্রভাব বাজারে পড়তে বাধ্য। সেই সাথে সার্বিক জিডিপিতে দক্ষিনাঞ্চলের অবদান বেড়ে যাবে।

 

এশিয়ান হাইওয়ের সাথে যুক্ত হলে ইকোনমিতে এর প্রভাব আরো বেশি পড়বে। 

খারাপ দিক হল, যত বেশি বিনিয়োগ বাড়বে ঠিক ততটা কৃষিজমি নষ্ট হবে। এজন্য এই দিকটায় খেয়াল রেখে শুধু ইকোনমিক জোনগুলাতে বিনিয়োগের ব্যাবস্থা করতে হবে। 

 

শেষকথা হল, পায়রা প্রকল্প নেবার কারণে ট্রাফিক যে পরিমান বাড়বে তাতে প্রতি টাকা বিনিয়োগে ২ টাকার বেশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক লাভ আশবে। 

আর একবার ভাবুন, এই এক খানা সেতু থেকেই প্রতিবছর দেশে যে পরিমান মানি সার্কুলেশন হবে তাতে বার্মার শুধু সামরিক বাজেট নয়, পুরা বাজেটের বেশি অবদান রাখতে পারবে। 

 

সবশেষে একটা সুসংবাদ দেই। পদ্মা সেতুর যেই ১৪ টা পায়ার নিয়ে ঝামেলা ছিল সেটা মিটে গেছে। সমাধান হিসাবে ৬ টা কৌনিক পাইলের মাঝামাঝি একটা ভার্টিকাল পাইল খাড়াভাবে পোতা হবে। ফলে এক্সট্রা লোড নেবার ক্ষমতা বাড়বে। এজন্যই এটাকে ভার্টিকাল পাইল সমাধান নামে ডাকা হচ্ছে। 

আরো একটু বিশদ আলোচনা  করলে ভাল হত। সময় কম। পরেরর পর্বে আরো বিস্তারিত বলব। ধন্যবাদ।