আমার খুব সৌভাগ্য যে আমি "তরুনের" মতো কালো নই, খাটো ছিলাম না, কিন্তু আমিতো হলে ছিলাম,সিট পেতে গণরুমে থেকে আমাকে রাজনীতি করতে হয়েছে, আমিও গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান, টিউশনি করে, কোচিং এ ক্লাস নিয়ে পড়েছি। কিন্তু আমার রেজাল্ট তো ৩.৭৪, আমিতো ১০-১২ টা চাকরি পেয়েছি ফাইন্যান্স ট্যাগ লাগিয়ে (চাকরির পরীক্ষায় ম্যাথ, ইংরেজি না পারলে এই ট্যাগ কোন কাজে আসে না) , আমিতো এখন আমার স্বপ্নের জায়গায়তেই আছি।

 

তাহলে কি "তরুনের" নিজের মানষিক দুর্বলতার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে? -না, মোটেই তা নয়।

 

অনেক কিছুই দায়ী- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, হলের রাজনীতি ব্যবস্থা, তরুনের বন্ধু, ক্লাসমেটের পাশাপাশি ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট কখনোই তরুনের মৃত্যুর দায় এড়াতে পারেনা। সবকিছু নিয়ে বিস্তারিত লিখা সম্ভব নয়। কারণ শিক্ষাব্যবস্থা, হলের রাজনীতি ব্যবস্থা বলতে গেলে সারা মাস লিখলেও শেষ হবেনা। এসবে অনেক দুর্গন্ধ। পরিবর্তন করাও কঠিন।

 

শুধু দুইটা বিষয় নিয়ে কথা বলব যা ক্ষুদ্র পরিসরে চাইলেই পরিবর্তন করা যায়।

 

(১) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কি প্রকৃত মুল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করছে? গ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় হিসাববিজ্ঞানের অংক ছাড়া কোন ধরণের গাণিতিক প্রশ্ন আসেনা(যা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরির পরীক্ষায় অনিবার্য), এতে করে গাণিতিক দক্ষতা না থাকা সত্বেও অনেকেই মেধা তালিকায় প্রথমদিকে স্থান পায়। আর সাবজেক্ট বাছাই এর ক্ষেত্রে কোন প্রকার যোগ্যতার বার/মাপকাঠি/শর্ত না থাকায় স্বভাবতই প্রথম দিকে যারা থাকে, তারাই ভালো চাকরি পাবার প্রত্যাশায় ফিন্যান্স লুফে নেয়। কিন্তু এই বিষয়ের কোর্স কারিকুলাম সম্পর্কে ভর্তির আগে খুব বেশি ধারণা থাকেনা, না থাকাটাই স্বাভাবিক। শুধু ফিন্যান্স নিয়ে অমুক ভাই তমুক হয়েছে, তমুক ভাই ফিন্যান্স নিতে বলছে এতটুকুই ভরসা অনেকের।

(আমি বলছিনা গণিত ই একমাত্র মেধা যাচাইয়ের মাধ্যম।যে ম্যাথ পারেনা, অন্য বিষয়ে তার অনেক মেধা অনেক প্রতিভা থাকতে পারে।)

 

ফিন্যান্স নেয়ার পর ম্যাথে দুর্বল একটা শ্রেণি বুঝতে পারে বিজনেস ম্যাথ, ক্যালকুলাস, ইকোনোমেট্রিক্স, ডেরিভেটিভস, ক্যাপিটাল বাজেটিং, পোর্ট ফোলিও ম্যানেজমেন্ট এর মতো কঠিন ম্যাথ তার পক্ষে সম্ভব নয়। ভালো সাবজেক্ট নেয়াটাই তখন তার জন্য কাল হয়ে দাড়ায়। রেজাল্ট খারাপ করে, ফেইল করে, চাকরি না পাওয়ায় সেই শ্রেণি টা ক্রমেই হতাশ হয়ে যায়।

 

কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় ম্যাথ এড করে যদি ফিন্যান্স নেওয়ার জন্য ম্যাথে ন্যুনতম নম্বর শর্ত দিয়ে দিতো তাহলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমে যেত। সেক্ষেত্রে ম্যাথে দুর্বল ছাত্রটি ভুল করে ফিন্যান্স নিয়ে হতাশ হওয়ার চেয়ে মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট বা অন্য কোন বিষয় নিয়ে ভালো রেজাল্ট করে, তার প্রতিভা দিয়ে ভালো চাকরি পেতো।(এর মানে এটা না যে মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট এর ছাত্র ম্যাথে দুর্বল)

 

খ ইউনিটেরও একই অবস্থা। মেধা তালিকায় প্রথম দিকে থেকে ইংরেজীতে বেশি নম্বরের শর্ত পুরণ করে অর্থনীতি, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ নিয়ে ম্যাথে দুর্বল থাকায় একটা শ্রেণী রেজাল্ট খারাপ করে, ফেইল করে হতাশ হয়ে পড়ে।

 

(২) এবার আসি আমার ফিন্যান্স বিভাগঃ

প্রথমত কৃতজ্ঞতা জানাই বিভাগের প্রতি, কারণ নিজের যোগ্যতা, আর এই বিভাগের ট্যাগ লাগিয়ে আমি আজ এখানে। আমার লেখা কোন ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। বরং এই জায়গায় আমার অধিকার বেশি তাই বেশি বলব।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের মতো এখানেও সমস্যা কম নয়। আমার ব্যক্তিগত কিছু অবজারবেশন তুলে ধরছি (অনেকের ভিন্নমত থাকতে পারে) -

-এই বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষককে সহযোগিতাপূর্ণ, সহানুভূতিশীল, বন্ধুত্বপূর্ণ মনে হয় না। সব শিক্ষকের কাছে সব ছাত্রদের এক্সেস করার সাহস নেই। ছাত্র ছাত্রীরা রীতিমত ভয় পায়। স্টুডেন্ট কাউন্সিলর আছে, কিন্তু সহানুভুতির সাথে কোন সমস্যা সমাধান করে দিয়েছে এরকম নজির খুব কম । তাই কেউ তাদের কাছে যেতে আগ্রহী নয়। কেন এমন? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারলে জানাবেন।

 

-কোর্স কারিকুলাম, পরীক্ষার প্রশ্ন, টেক্স বুক, শিক্ষকদের যোগ্যতা আন্তর্জাতিক মানের হলেও, তাদের অধিকাংশের ক্লাস নেয়ার দক্ষতা, বুঝানোর দক্ষতা, মানষিকতা ও ধৈর্য কোনটাই সেই মানের নয়। এই দুইয়ের মাঝে গ্যাপটা যে নিজে, বন্ধুদের সহযোগিতায় কাভার না দিতে পারে তার খারাপ ফলাফল অনিবার্য। আর যে পারে সে সফল, সে এশিয়ার সেরা বিজনেস স্কুলে পড়ছে।

 

আমার এই কথার সাথে একমত না থাকলে বুকে হাত দিয়ে বলবেন বিজনেস ম্যাথ টু, স্ট্যাট টু, বিজনেস ফোরকাস্টিং, ডেরিভেটিভস, পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট(এমবিএ র কোর্সটা) কোর্সের ক্লাসগুলিতে কয়জন সন্তুষ্ট, এবং ক্লাসগুলি সব ছাত্রছাত্রীর বুঝার সামর্থের কথা মাথায় রেখে নেয়া হয় কিনা তা কমেন্টে জানাবেন।

 

- দেশের বাইরে গিয়ে সেটেল হওয়ার প্রবণতা এই বিভাগের শিক্ষকদের বেশি। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যারা থেকে যায় তারা সত্যিই দেশপ্রেমিক, সন্দেহ নেই, এই সংখ্যাও বেশি।

 

-৫ টা কোর্সের মিডটার্ম টানা ৫ দিনে নেয়া হয়, এত বিশাল সিলেবাস একদিনে কাভার দেয়া পসিবল না, অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ফ্যাকালটির অন্য বিভাগ গুলতে প্রতি টি মিডটার্ম এর আাগে যথেষ্ঠ সময় দেয়া হয়। চাকরির পরীক্ষা বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা চিন্তা করে রিসিডিওল করা হয় যা ফিন্যান্স এ অকল্পনীয়।

 

-কিছু কোর্সের প্রশ্ন সেট করতে শ্রেণীর সবার কথা মাথায় রেখে করা হয় না। যার ফলে একটা শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা সব সময় ফলাফলে পিছিয়ে পড়ে। শুধুমাত্র রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কারণে যোগ্যতা থাকা সত্বেও অনেকে চাকরিতে আবেদন করতে পারেনা। তার সমান বা কিছু কম মেধাবী হয়েও অন্য সাবজেক্ট এর ছাত্রটি সেই চাকরি লুফে নেয়। আর এর কপালে জুটে হতাশা আর অপমানের গঞ্জনা। অথচ শিক্ষকদের বক্তব্য ফিন্যান্স বিভাগের এর জিপিএ ৩ মানে অন্যদের ৩.৫। কিন্তু জব মার্কেটের অনেকেই এই রিলেটিভিটি তত্ত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ। এমনকি কতিপয় দুষ্প্রাপ্য শিক্ষকগণ তাদের কোর্সে কম নম্বর পাওয়া এবং ২-৪ টা ফেইল করাকে অনন্য যেগ্যতা মনে করেন।

 

-মাঝে মাঝে কিছু কোর্সে প্রেজেন্টেশনের ঠ্যালায় কোর্সের মূল বিষয়বস্তু হারিয়ে যায়। স্লাইড, রিপোর্ট তৈরি করতে করতে অন্যান্য কোর্স পড়ার সময় পাওয়া যায় না। গ্রামের যেই দরিদ্র ছেলেটির ল্যাপটপ নেই, স্মার্ট নয় তার ভালো গ্রুপে এনলিস্টেড হওয়া মুসকিল। কারণ সারাদিন ক্লাস করে, বিকালে টিউশনি করে যখন সে হলে ফিরে তখন ল্যাব বন্ধ। তাই গ্রামের দরিদ্র হলের গণরুমের ছেলেগুলা নিয়ে কিছু গ্রুপ হয়। আর তাদের প্রেজেন্টেশনের ড্রেস আপ, ইংরেজী বলাতে আঞ্চলিক উচ্চারণ, টান দেখে এক শ্রেণি খুব মজা পায়। দিনে দিনে ইংরেজী ঠিক হয়, ড্রেসআপ ও ঠিক হয়, কিন্তু হীণমন্যতা থেকে যায় অনেকদিন। তাদেরকে সাপোর্ট দেয় হলের কিছু বড়ভাই, যারা তাদের মতোই ভিকটিম ছিলো।

 

- পরীক্ষার রেজাল্ট দিতে অনেক দীর্ঘসূত্রিতা করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সেশনের হয়েও অনেক চাকরিতে আবেদন মিস হয়ে যায়। মিডটার্ম ছাড়া, ফাইনাল পরীক্ষার, ভাইভার মার্কস প্রকাশ করা হয়না। কোনটার মিডটার্ম ও না, কোথায় কিভাবে খারাপ হল বুঝাই মুসকিল হয়ে যায়।

 

- অন্যান্য বিভাগের ন্যায় এখানেও এমবিএতে সান্ধ্যকালীন কোর্সে উৎসাহিত করার প্রবণতা রয়েছে।

-লবিংবাজি এখানেও আছে তবে অন্য ডিপার্টমেন্টের চেয়ে অনেক কম। শিক্ষক নিয়োগেও তা অন্য ডিপার্টমেন্টের চেয়ে কম।

 

জানি এসব সমালোচনা করলে কারো কোন বোধোদয় হবেনা। বরং ভালো পজিশনে গিয়ে আজ অকৃতজ্ঞ হয়ে গেছি,অনেক বেশি বুঝি, এসব খ্যাতিই জুটবে। কিন্তু আমিতো একা নই, অনেকেই বলছে এবং বলে থাকে । তার মানে কিছু সমস্যা অবশ্যই আছে। যাইহোক তারপরও এসব লিখে "তরুনের" মৃত্যুতে নিজের বুকফাটা কষ্টটা একটু হালকা হবে।