আমাদের গর্বের গার্মেন্টস শিল্পের দ্বিতীয় অবস্থান হয়ত কয়েক বছরের ভেতর হাত ছাড়া হয়ে যাবে ভিয়েতনামের কাছে। আমাদের বৃহৎ বাজার আমেরিকায় অনেক আগেই তারা আমাদের অতিক্রম করে গেছে।

 

শুরুতেই আসি ভিয়েতনামের অর্থনীতির কিছু দিক নিয়ে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ জিডিপি এর বিচারে ভিয়েতনামের থেকে এগিয়ে। তাদের জিডিপি $২২৩ বিলিয়ন ডলার। আর বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় $২৫০ বিলিয়ন। ভাবছেন বাহ। ভালইত। না । ভাল না। ভিয়েতনাম এর রপ্তানি কত জানেন? বেশি না মাত্র $২১৪ বিলিয়ন ডলার ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী। আর আমাদের? মাত্র $৩৫ বিলিয়ন। আমদানির ক্ষেত্রে ২০১৭ সালে ভিয়েতনামের এই সংখ্যাটা প্রায় ২১১ বিলিয়ন ডলার। বিদেশি বিনিয়োগের স্টক $১১৪ বিলিয়ন ডলার। কথা হল যে দেশটির আহামরি কিছুই ছিলনা সেই দেশটির হঠাৎ এরকম উত্থান কিভাবে হল? ঠিক কোন দিকে আমরা বার বার ব্যার্থ হচ্ছি? প্রশ্নগুলার উত্তর সন্ধানে কিছু ঘটনা ঘুরে আসা যাক।

 

vietnamnetbridgevietnamnetbridge

 

১৯৯৬ সালে EPZ ACT  পাস করা হয়। এর প্রেক্ষিতে দেশের প্রথম ও বৃহৎ বেসরকারি EPZ হিসাবে দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াং ওয়ান গ্রুপ KEPZ এর লাইসেন্স পায়। ১৯৯৯ সালে ২৫০০ একর জমির উপর বিশাল এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে কোম্পানিটি বেশ কিছু কারখানা করে। কিন্তু শুরু হয় আমাদের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য। ভেবে দেখেছেন কোন দেশের উন্নতির জন্য প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। আপনি চাইলেন সেখানে কিছু বিনিয়োগ করতে। কিন্তু আপনার লাইসেন্স পেতেই চলে গেল এক যুগ। এবার বলেন আপনি কি চাইবেন সেখানে বিনিয়োগ করতে? আপনার এই অবস্থা দেখে আপনার পরিচিত অন্য কেউ কি ঝুকি নিবে বিনিয়োগ করার???

 

ঠিক একি কাজ হয়েছে KEPZ এ। ১৯৯৯ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করার পর পুরা ৮ টি বছর লেগেছে অপারেশন লাইসেন্স পেতে। মানে ২০০৭ সালে যেয়ে তারা লাইসেন্স পায়। আর পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে পুরা ১০ বছর। ২০০৯ সালে যেয়ে তারা সেটা পায়। এর মাঝের সময়ে দেওয়া হইনি বিদ্যুৎ, পর্যাপ্ত গ্যাস। এরপরো কোম্পানিটি চেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার অন্য কোম্পানি গুলাকে তাদের জোনে বিনিয়োগ করাতে। স্যামসাং কোম্পানিটি ২০০৫-০৬ এর দিকে আগ্রহি হয়। কিন্তু এদেশের অব্যাবস্থাপনা, বিদ্যুৎ এর অবস্থা এসব দেখে কি করবে সেটা আপনারাই ভাল বুঝবেন। এরপরও একবার স্যামসাং এর সিইও বাংলাদেশে এসেছিলেন মোবাইলের কারখানা করবার জন্য। কিন্তু সেবারও তারা বাংলাদেশ নাকি মিয়ানমার, কোনটা ভাল হবে সেই দ্বিধায় ফেরত যায়। ২০০৯ সালে সেই বিনিয়োগ স্যামসাং করেছিল। কিন্তু স্থান বাংলাদেশ বা মিয়ানমার কোনটায় হইনি। $৫ বিলিয়নের সেই বিনিয়োগ চলে যায় ভিয়েতনামে। এর পরের অবস্থান কি সেটা সবাই জানেন।

 

ipezoneipezone

 

ইলেক্ট্রনিক্স এ বিপ্লব আসে ভিয়েতনামে। যেখানে ভিয়েতনামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ব্যাতিত কোন বড় শিল্প গড়ে উঠেনি, সেই ভিয়েতনাম সারা বিশ্বের ইলেকট্রনিক্স বাজারে "মেড ইন ভিয়েতনাম" নামে আলাদা একটা ব্রান্ড গড়ে তোলে। ২০১৪ সালে শুধু স্যামসাং এর ভিয়েতনাম ইউনিট থেকেই রপ্তানি হয়েছে $২৫ বিলিয়ন ডলার যা কিনা সেই সময়ে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির সমান।  বিনিয়োগ নির্ভর করে সফলতার গল্প থেকে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি স্যামসাং এর সফলতার গল্প ছড়িয়ে পড়ে। একে একে এখন প্রায় ৪০০০ এর মত দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানির বিনিয়োগ এই ভিয়েতনামে। ভিয়েতনামের সব থেকে বড় বিনিয়োগকারি দেশ হিসাবে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নাম। গল্পটা কি বাংলাদেশের হতে পারত না?

 

english.vietnam.vnenglish.vietnam.vn

 

ইয়াং ওয়ান গ্রুপের জোনেই এই স্যামসাং বিনিয়োগ করতে চেয়েছিল। আজ লাল ফিতার পরিবর্তে রঙটা যদি সাদা হত, দ্রুত পদক্ষেপ নেবার ব্যাবস্থা করতে পারতাম আমরা হয়ত আজ আমাদের রপ্তানি আয় $৩৫ বিলিয়নের পরিবর্তে $৩০০ বিলিয়ন হলেও অবাক হতাম না। সব থেকে বাজে ব্যাপার কি জানেন? ২০১৫ সালের দিকে এসে আমরা আবার সিদ্ধান্ত নিতে গেছি যে KEPZ এ যে ২৫০০ একর বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে সেটা থেকে ২০০০ একর সরকার আবার ফিরিয়ে নিতে চাই। সরকারের বক্তব্য তারা জমির সঠিক ব্যাবহার না করে ফেলে রাখছে। দোষ টা কি তাদের না আমাদের? আমরা তাদের লাইসেন্স দিতেই ১০ বছর পার করে দিয়েছি। আমরা সফলতার গল্পকে ব্যার্থতার গল্পে পরিণত হতে দিয়েছি। এরপরো স্যামসাং আমাদের দেশে সল্প পরিসরে হোম এপ্লায়েন্স, টিভি, ফ্রিজ তৈরির কারখানা করেছে। এলজি, হুয়াউই, বিবেচনায় রাখতেছে। হোন্ডা বিনিয়োগ করেছে। এই প্রতিটি বিনিয়োগ কে আমরা যদি সফলতার গল্পে রুপান্তর করতে ব্যার্থ হই তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কি সেটা ভাবতে পারছিনা। অতিত থেকে শিখতে হবে।

 

ডুয়িং বিজনেস রেটিং এ ভিয়েতনামের অবস্থান ৬৮ তম। আমাদের অবস্থান ১৯০ টা দেশের ভেতর ১৭৭ তম। যেখানে বিনিয়োগ এর জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করতেছে সব দেশ সেখানে আমাদের ভূমি জটিলতা, বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদনের জটিলতা, গ্যাসের জন্যও একি অবস্থা, কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন এর জন্য দৌড়াও আরের প্রতিষ্ঠানে। হ-য-ব-র-ল অবস্থা থাকলে কিভাবে সম্ভব?? সরকার লক্ষ নির্ধারণ করেছে ২০২১ সালের ভেতর ডুয়িং বিজনেস রেটিং ১০০ এর নীচে নামিয়ে আনবে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হবে।

 

অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের সহযোগীতায় আমরা আগের থেকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করি এইসব বিষয়ের জটিলতা কাটিয়েও আমরা বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে পারব। এদেশের অর্থনীতি আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে।