ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ট্রান দাই কুয়াং এর বাংলাদেশ সফর টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এটা বাংলাদেশের চলমান এশিয়ার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি ধাপ হিসাবেই দেখা যায়। এর আগে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ভিয়েতনাম সফর করে এসেছেন। এবারের সফরে একটা বিষয় নজরে পড়ল। প্রধানমন্ত্রী মেকং-গঙ্গা কোয়াপারেশন ফোরামে যুক্ত হতে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টের সমর্থন চেয়েছেন। সেই সাথে আসিয়ান ফোরামের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসাবে যুক্ত হবার জন্য ও সমর্থন প্রত্যাশা করেছেন।

 

এবার একটু গভীরে যাওয়া যাক। রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এতদিন বাংলাদেশ ইউরোপ এবং আমেরিকার উপর নির্ভর করত। রানা প্লাজা, তাজরিন ফ্যাশন, জিএসপি প্রত্যাহারের মত কিছু ঘটনা বাংলাদেশকে বিকল্প বাজারের সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছে যেটা হওয়া উচিত ছিল অনেক আগেই। এশিয়ার দেশ হবার সত্যেও রপ্তানি বাণিজ্যে এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের অংশ খুব সীমিত। নতুন বাজার উন্নয়ন, পণ্য উন্নয়ন, বর্তমান বাজারে আরো সুবিধা গ্রহণ এসব ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে।

 

 

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সারা বিশ্বে সহযোগিতার অন্যন্য নজির। এক জোট হয়ে সব ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলি একটি অভিন্ন বাজার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ইউরোপের বাইরে এরকম সফল কোন সংস্থার কথা বলতে গেলে অবশ্যই বলতে হবে আসিয়ান দেশ গুলার কথা। পারস্পারিক দ্বন্দ ভুলে তারা শক্তিশালি এবং অভিন্ন বাজার গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশ চাইছে এখন এশিয়ান দেশ গুলার সাথে সম্পর্ক বাড়াতে। প্রশ্ন হল বাংলাদেশ কি আসিয়ান এর সদস্যপদ পেতে পারে?? টেকনিক্যালি আসিয়ানের সদস্যপদ পাওয়া বাংলাদেশের জন্য সম্ভব না। কারন আসিয়ান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ গুলির সংস্থা। ভৌগলিক ভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র, দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার না। আসিয়ান বিভিন্ন কারণেই এই অঞ্চলে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। তাহলে আমাদের কি করা যেতে পারে?

 

 

 

আসিয়ানে রয়েছে বিশাল বাজার সেই সাথে ভৌগলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব। ভারত আসিয়ান দেশগুলির সাথে আসিয়ান ফ্রি ট্রেড চুক্তি করে বেশ সফল। এছাড়া আসিয়ান প্লাস থ্রি এর আওতায় জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে চুক্তি রয়েছে। আসিয়ান দেশগুলার সাথে চীনের বাণিজ্য গেল বছর $৫০০ বিলিয়ন অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ সেরকম কিছু চুক্তি করতে চাচ্ছে সেটা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি দেখলেও বুঝা যায়। এখানে বলে রাখা ভাল, আমেরিকা ইউরোপ যখন বার্মায় অবরোধ আরোপ করে তখন এই আসিয়ান দেশগুলি বার্মার বাণিজ্যের সব থেকে বড় বিকল্প হয়ে উঠে। যেকারনে তাদের উপর অবরোধের খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। বার্মার বড় সাপোর্ট কিন্তু এই আসিয়ান দেশগুলাই।

 

মেকং-গঙ্গা সহযোগিতা ফোরামে সদস্যপদ পেতে কার্যত কোন বাধা নাই। আর আসিয়ান দেশগুলির অধিকাংশ দেশগুলি এমজিসি এর সদস্য। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এই সংস্থার সদস্য গুলির মধ্যে রয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড, বার্মা, কম্বোডিয়া, লাউস ও ভিয়েতনাম। সংস্থার সহযোগিতার মুল খাত গুলি হচ্ছে পর্যটন, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং যোগাযোগ। মেকং এবং গঙ্গা নদীর নামের মাধ্যমে যোগাযোগের নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

 

ভারত বাংলাদেশকে এই সংস্থার সদস্যপদ পেতে অসহযোগিতা করবে কিনা সেটা বলা মুশকিল। তবে যদি বাংলাদেশ এটির সদস্যপদ পায় তবে আসিয়ানের সাথে সম্পর্ক আরো গভীর করার সুযোগ তৈরি হবে। সেই সাথে যদি সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হতে পারে তবে ভবিষ্যতে আসিয়ান এর সাথে ফ্রি ট্রেড চুক্তি করার পথ আরো সুগম হবে নিশ্চিত। সেই সাথে বাড়তি যেটা পাওয়া যাবে সেটা হল বার্মার উপর পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা।

 

এদিকে বাংলাদেশ বিমসটেকের সদস্য হিসাবে আশিয়ানের দুটি দেশ বার্মা এবং থাইল্যান্ডের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধির পথ খুলে রেখেছে। মেকং-গঙ্গা সহযোগিতা ফোরামের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বাদে সব দেশের সাথে সম্পর্কের দ্বার প্রসারিত হবে। আর ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আগের থেকে অনেক শক্তিশালী। রোহিঙ্গা ইস্যু এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এই দেশগুলির সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির নতুন মাত্রা যোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই যদি আসিয়ানের সুবিধা বাংলাদেশ পেতে চায় সেক্ষেত্রে সঠিক পথেই হাটছে বাংলাদেশ।

 

বাংলাদেশের এই সংস্থায় যোগ দেবার আগ্রহ প্রকাশ এবং সমর্থন আদায়ের চেষ্টাকে পররাষ্ট্রনীতির সফল একটা পদক্ষেপ হিসাবেই দেখা যায়।