উত্তরটির আপেক্ষিক। তবে পুরাটা পড়লে উত্তরটি নিজেই পেয়ে যাবেন আশা রাখি।

 

বাংলাদেশ ২০০৯ সালে গভীর সমুদ্র বন্দর করবার উদ্যোগ গ্রহণ করে। যাচায় বাছায় এর পর অনেকগুলি স্থানের সাথে সোনাদিয়া দ্বীপের কথাও বলা হয়। কিন্তু প্রাথমিকভাবে অর্থসংস্থান নিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়। কারন খরচ ছিল গগনচুম্বী।  পরবর্তীকালে চীন অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করে। যেটা দেখে ভারত এবং আমেরিকা সঙ্কিত হয়ে চাপ দিতে থাকে না করার জন্য।

 

মূল আলোচনার আগে কেন আমাদের গভীর সমুদ্র বন্দর দরকার সেটা জানা প্রয়োজন। বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির সিংহভাগ হয় ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। বঙ্গোপসাগর এর ১৬ কিমি উজানের এই বন্দরটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ব্যার্থ। বর্তমান অবকাঠামোয় ২৫০০-৩০০০ টিইইউ (টোয়েন্টি ফিট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) ভেসেল ভিড়তে পারে। যেখানে আধুনিক গভীর সমুদ্র বন্দরগুলিতে সাধারনত ৫০০০-১৮০০০ টিইইউ এর মাদার ভেসেল ভিড়তে পারে। স্বাভাবিক কারনেই পণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে যায় কারন পণ্যকে মাদার ভেসেল থেকে আনলোড করে ছোট জাহাজে লোড করতে হয়। সেই জাহাজ ভেড়ে চট্টগ্রাম বন্দরে। এরপর সেটিকে আনলোড করা হয়। এছাড়া বন্দরে ৯.৫ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে না।

 

এরপরো এই বন্দর দিয়ে ২০১৬ সালে প্রায় ২.৩৪৬ মিলিয়ন টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডেল করা হয়েছে। ২০৪০ সাল নাগাদ আমাদেরকে প্রায় ৫.৪ মিলিয়ন বা তার বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডেল করতে হবে যা কার্যত অসম্ভব বর্তমান বন্দর দিয়ে।

 

বার্মার সিত্তও বন্দরের বর্তমানে ২০০০-৩০০০ টিইইউ এর ভেসেল ভিড়তে সক্ষম হলেও উন্নয়নের পর ৬০০০ টিইইউ এর ভেসেল ভিড়তে পারবে। কিন্তু বন্দর এর আকার ছোট হবার ফলে এটা আন্তর্জাতিক ভাবে খুব বেশি গুরুত্ববহন করতে সক্ষম নয়। এর প্রেক্ষিতে চীন রাখাইনে নতুন বন্দর করতেছে। যদিও এটার আকার এবং ক্ষমতাও খুব বেশি হবে না।

 

এবার দেখে নেই  সোনাদিয়া ও মাতারবাড়ি বন্দর সম্পর্কে

 

মাত্র ৯ বর্গ কিমি এর একটা দ্বীপ সোনাদিয়া। এই চ্যানেলের প্রাকৃতিক গভীরতা প্রায় ১৪ মিটার যেখানে ১২মিটারের বেশি গভীরতা হলেই গভীর বন্দরের জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করা যায়। তবে এখানে বন্দর করবার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। দ্বীপটি আকারে ছোট হবার কারনে সমন্বিত অন্যান্য প্রকল্প করবার সুযোগ কম। বন্দর চ্যানেলের দৈর্ঘ কম হবার জন্য ভবিষ্যতে এটাকে আরো বড় করার জন্য বাধা হতে পারে। এছাড়া এটি বার্মা সীমান্ত থেকে কাছে হবার কারনে ঝুকি থেকেই যায় কারন এটি বার্মার আর্টিলারি রেঞ্জের মধ্যে।

 

অন্যদিকে মহেশখালী দ্বীপের আয়তন প্রায় ১৪ বর্গকিলোমিটার।  সেই সাথে মাতারবাড়ি চ্যানেলের দৈর্ঘ প্রায় ১৪.৫ কিমি। ভাটার সময় গভীরতা থাকে প্রায় ১৪ মিটার। আর জোয়ারের সময় প্রাকৃতিক ভাবেই গভীরতা হয় প্রায় ১৮.৫ মিটার। যদি ড্রেজিং করা হয় তবে গভীরতাকে আরো বাড়ানো সম্ভব।

 

মাতারবাড়ি এর লোকেশন নির্ধারণ এবং কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ আর এসবের নিমিত্তে বন্দর করবার কাজ পেয়েছে জাপান। শুরু থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়নি। খরচ ছিল ৩৬ হাজার কোটি টাকা যার ভেরর জাপান অর্থায়ন করবে ২৯ হাজার কোটি টাকা। আপাতত প্রায় ৪৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করা হবে। কয়লা নামানোর জন্য বন্দর সুবিধা এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত। 

 

প্রশ্ন হল মাতারবাড়িতে কেন করা হবে? শুরুতে বলে রাখি সোনাদিয়া বন্দর এবং মাতারবাড়ি বন্দর এর দূরত্ব মাত্র ২৫ কিমি। মাতারবাড়িকে এখন গভীর সমুদ্র বন্দরে রুপান্তর করার কথা বলা হচ্ছে সোনাদিয়াকে বাদ রেখে।

 

একটা বন্দর করা এত সহজ কাজ নয়। প্রচুর অর্থায়নের প্রয়োজন পড়ে। সোনাদিয়ার ভবিষ্যত নিয়ে সন্দেহ থাকলেও জাপানিজ বিনিয়োগে মাতারবাড়ি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হল যেহেতু এই দুইটি দ্বীপের দুরত্ব মাত্র ২৫ কিমি, সেখানে কেন সোনাদিয়া বন্দর করা হবে? কারন মাতারবাড়িকে যদি গভীর সমুদ্র বন্দরে পরিণত করা যায় তাহলে মাত্র ২৫ কিমি দূরে আরেকটি বন্দর করা হবে অর্থের বড় অপচয় এবং অপ্রয়োজনীয়। 

 

আরেকটা বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ।  শুধু বন্দর করলে কি অর্থনৈতিক সুবিধা বেশি পাবে বাংলাদেশ নাকি যদি বন্দরকে ঘিরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলে সয়ংসম্পুর্ন করা যায় তাহলে?

 

মাতারবাড়িকে আরেকটু বিশ্লেষণ করা যায়। ২০৪১ সাল নাগাদ শুধু এই দ্বীপে বিদ্যুৎ তৈরির লক্ষমাত্রা প্রায় ১৫০০০ মেগাওয়াট।  সেই সাথে এখানে প্রায় ২৪ হাজার একর জমি স্পেশাল জোনের জন্য অধিগ্রহন করা হবে। এর ভেতর ট্যুরিজমের জন্য আলাদা জমি রাখা হবে। এই দ্বীপেই করা হবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন।

 

কিন্তু যদি সোনাদিয়া দ্বীপের দিকে দেখি, তাহলে বুঝা যায় সোনাদিয়া চ্যানেল মাতারবাড়ির মত এত বড় নয়। সেই সাথে দ্বীপের আয়তন ছোট। এখানে এত ভারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন করা সম্ভব নয়। এখানে ছোট্ট একটা উদাহরন দেয়া যাক। ধরুন আমরা উত্তর বঙ্গে একটা কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে চাই যেখানে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করতে প্রতিদিন কয়লা প্রয়োজন হবে ১০০০০ মেট্রিক টন। উত্তর বঙ্গের কয়লা ক্ষেত্র দিয়ে খুব বেশিদিন এটা চালু রাখা সম্ভব নয়। তাই কয়লা আমদানি করতে হবে। সেক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া থেকে একটা মাদার ভেসেলে ১ লাখ টন কয়লা চট্টগ্রাম বা মংলা বন্দরে ভীড়ল। এরপর সেটাকে আনলোড করা হল। এরপর সেটিকে মালবাহী ট্রেন অথবা ট্রাকে করে করে প্রতিদিন বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া লাগতেছে। এখানে বিদ্যুৎ এর খরচ কতটা বাড়বে ভেবে দেখেছেন? জাহাজ থেকে আনলোড করার খরচ। আবার ট্রাকে বা ট্রেনে তোলার খরচ। পরিবহণ খরচ, শ্রমিকের বাড়তি মজুরি এরকম অনেক কারনে খরচ অনেক বাড়বে। তাছাড়া লোকালয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করলে পরিবেশের হুমকিত আছেই। কারন লোডিং আনলোডিং এর সময় প্রচুর কয়লা পড়ে যাবে। মিশে যাবে পরিবেশের সাথে।

 

কিন্তু যদি এমন হয় যে মাদার ভেসেলটি সরাসরি মাতারিবাড়িতে ভীড়ে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টার্মিনালে আনলোড করা হচ্ছে। ওখান থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ তৈরি করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। নিশ্চিত ভাবেই সেটা খরচ কমিয়ে দেবে। মাতারবাড়ির বিশাল চ্যানেল এই একটি কারনেই একে স্বতন্ত্র  করেছে।

 

ভিয়েতনামের অর্থনীতি।। স্যমসাং এর বিনিয়োগ বাংলাদেশ থেকে ভিয়েতনামে।।

মেকং-গঙ্গা সহযোগিতা ফোরাম, আসিয়ান এবং বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তি।

বাংলাদেশের সমুদ্রে অবরোধঃ সম্ভাবনা ও প্রস্তুতি।