২০০৮ সালে ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষায় আমি খ ইউনিটে ৬ষ্ঠ মেধাস্থান অর্জন করি, ঘ ইউনেট ১০ম মেধাস্থান এবং আই ই আর এ ২ য় মেধাস্থান অর্জন করি । এছাড়া কুমিল্লা বিশ্ব:তে ১ম, খুবি তে ৭ম এবং ১২তম, ইবিতে ২য় এবং ৫ম হয়েছিলাম আর্টস রিলেটেড ইউনিটগুলোতে । বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষা দেওয়ার টার্গেট ছিলো না বলে পরীক্ষা ও দেই নাই্ ।

 

আমরা ৭ জন বন্ধু খুলনা বানরগাতির একটা তিনতলা ভবনের চিলেকোঠায় ২ টা রুমে মেস করে থাকতাম । আমরা সদ্য আলিম ( এইচ এস সি ) পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং এ ভর্তি হয়েছিলাম। আমরা সবাই ওই সময়টাকে এখনো স্মরণ করি আমাদের সবার লাইফের টানিং পয়েন্ট হিসেবে । ওই মেস টা ছিল আমাদের সোনালী সময়। । আমাদের পড়াশুনার স্টাইলটাই ছিলো ভিন্ন । আমরা মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউনেডর ছিলাম । সো , আমরা রাত ১১ টার আগে ঘুমিয়ে যেতাম । 


মাঝরাতে চুপিচুপি জেগে উঠতাম এবং প্রথমে ওয়াশরুমে গিয়ে ( আলো না জ্বালিয়েই) অজু করে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তাম গোপনে । কে আগে উঠবে এ নিয়ে মনে মনে প্রতিযোগিতা করতাম । দেখা যেত একজন নাামাজ পড়তে দাড়িয়েছে, অন্ধকার থাকার কারনে আমি তারে মাড়িয়ে দিয়েছি অথবা আমারে কেউ মাড়িয়ে দিয়েছে । তারপর ছাদে গিয়ে ছাদের লাইট জ্বালিয়ে বা নিজস্ব চার্জার লাইট বা টেবিল লাইট জ্বালিয়ে পড়াশুনা করতাম । ফজরের নামাজ পড়ে আরো কিছুক্ষন পড়ে তারপর হাল্কা বিশ্রাম নিয়ে কোচিং যেতাম। 

 

আমরা প্রচুর গ্রুপ স্টাডি করতাম এবং এক জন আরেকজনকে প্রশ্ন ধরতাম । এমন ও হতো আমরা সবাই একসাথে খেতে বসতাম না। একজন বাদে বাকিরা খেতে বসত এবং সে আমাদেরকে সিট / বই থেকে প্রশ্ন করতো । 
তখন পড়াশোনার গতিটাই ছিলো আলাদা। আমার তেমন কোন স্বপ্ন ছিলো না তখন । এমনকি বিলিভ মি, আমি আলিম পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে জানতামই না যে মাদ্রার ছাত্ররাও ঢাবি বা এরকম প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারে। আমার টার্গেট ছিলো আলিমের রেজাল্ট বের হলে ফাজিলে ভর্তি হবো্। আলিম পরীক্ষার পরে আমার কোন এক বন্ধু আমাকে কল দিয়ে জানায় যে তারা ভার্সিটি এডমিশন এর জন্য কোচিং করতেছে । আমাকে ও বুঝায় । তখন আমি চলে আসি । মে বি সেই বন্ধুটি এই তিন জনের কেউ Khalid, Tajammul / Jobayer । যেই হোস্ তার জন্য আজীবনের দোয়া থাকলো ।


Saifullah ছিল আমাদের মধ্যে সবার চেয়ে মেধাবী । ক্লাসে ফার্স্ট ছিল ও । গোল্ডেন এ প্লাস ও পেয়েছিল । কোচিং এ ভাল করতে লাগল । তারপর ছিল Khalid ও ছিল ভীষন স্টাডিয়াস । ওর পরিশ্রম দেখে নিজের পরিশ্রমকে এক্কেবারে সিন্ধুর সাথে বিন্দু তুলনা মনে হইত । খালিদ ও গোল্ডেন পাওয়া ছাত্র। ক্লাসে আমি ছিলাম সেকেন্ড বয় । বাট গোল্ডেন পাই নাই । এ জন্য বুকে তখন একবুক জ্বালা।  Tajammul আর Jobayer ছিল খুবই রসিক এবং বাংলা সাহিত্যের ওস্তাদ মানুষ। । ওরা আমাদের দিন রাত্রির আনন্দের রসদ জুগিয়ে যেতো । আরো ছিল Mamun এবং Aqunzi আমাদের সাথে ছিলো কয়েকমাস । কিন্তু আর্থি ক সমস্যর কারণে মামুন আমােদের সাথে কন্টিনু করতে না পেরে জবে জয়েন করে এবং সে এখন অনেক সফল। 
আমাদের ওই ৬ জনের ৩ জন ঢাবিতে ২ জন ইবিতে চান্স পেয়েছিলাম ।

 

আমি কোচিং এর আস্তে আস্তে ভাল করতে লাগলাম । নিজের সাথে নিজে কম্পিটিশান শুরু করলাম এবং নিজেকেই নিজে টপকানোর চেষ্টা প্রতিনিয়ত করতে থাকলাম । বি এল কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিলাম , মাসখানেক পরে স্বপ্নটা আরেকটু বড় করে ই বি তে নিয়ে গেলাম তার পরের মাসে নিয়ে গেলাম খু বি তে আর তারপরে চিন্তা করলাম জাবি অথবা জবি । ফাইনালি পরীক্ষার মাস তিনেক আগে চিন্তা করলাম ঢাবিতে আমার দ্বারা সম্ভব । এবং আরো মাসখানেকের মধ্যে চিন্তা করলাম প্রথম দিকের পজিশনে ও থাকা সম্ভব । বন্ধুরা ও উৎসাহ দিচ্ছিল এগিয়ে যেতে । দেখা গেল সে বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসল । ২০০৭ এর জুলাই - আগস্টে যে ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা তা পেছাতে পেছাতে চলে গেল ২০০৮ এর ফেব্রুয়ারি।  ওই মেসে আমার বন্ধুরা এক এক করে বাড়িতে চলে যেতে লাগলো । শেষ পর্যন্ত থাকলাম শুধু আমি একা। ওই রুম দুটো মালিক ভাড়া দিতে না পেরে বাধ্য হয়ে আমাকে একা চার মাস রাখলো । এই সময়টাতে বাগেরহাটের দুই ভাই ( নাম ভুলে গেছি ) আমার সাথে ছিলো । এ সময় আমাকে পেইং গেস্ট হিসেবে আশ্রয় দিয়ে, নিয়মিত সুস্বাদু খাবার দিয়ে ভাইয়ের মত আদর যত্ন করে আমাকে পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছেন খুলনার আজহার ভাই এবং শারমীন আপা । আমি ওনাদের কাছে চির কৃতজ্ঞ ।

 

ভার্সির্টিতে ভর্তি পরীক্ষার সময় এবং এর পরে আমার ইমিডিয়ট সিনিয়র শ্রদ্ধের ইমরান ভাইয়ের কাছে জহুরুল হক হলের ৪০০৯ নাং রুমে থাকতাম । ওখানে থাকতেন Faizullah Fayez ভাই Abdur Rahim ভাই , যারা তখন আইন বিভাগে পড়তেন । আমি খ ইউনিটের পরীক্ষার সব কয়টাই দাগিয়ে এসছিলাম বলে সেদিন ওনারা বলেছিলেন , করেছোটা কি ? ঢাবির ইতিহাসে এমন বোকা পোলা আছে কিনা সন্দেহ । আমি ও একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম । মেধাতালিকার শীর্ষে থাকব এই টার্গেট নিয়েই পরীক্ষার হলে বসেছিলাম । আমার পরিচিতরাও জানত আমি র্শীর্ষ ৫ এ থকাব । কিন্তু পরীক্ষার প্রশ্নগুলো আমার মাথা এলামেলো করে দিলো । আমি ভাবলাম মে বি আমি অনেক রং উত্তর করে ফেলেছি । ভার্সিটি মে বি আমার কাছে উল্টো নাম্বার পাবে। এজন্য আমি হতাশ মনে পরীক্ষার পর থেকে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম । সন্ধার পরে আমার এক বন্ধু তাজাম্মুল এস বলল , চল মিলিয়ে তো দেখি কি অবস্থা । মিলাতে বসে আবিষ্কার করলাম যে আমার ভালোই হয়েছে। আবার আশা ফিরে আসল বুকে।

 

তিনদিন পরে যখন রেজাল্ট হলো আর আমি ৬ষ্ঠ হলাম তখন ভাইরা আমার পিঠ চাপড়ে দিল।  আমি ৬ষ্ঠ হওয়ার সুবাদে ওই রুমটাতে আরো ২ মাসের মত থাকার অবাধ সুবিধা লাভ করলাম । রুমটার অবস্থান একটা বড় ছাদের পাশে এবং একবারে শেষ প্রান্তে বলে খুবই নিরিবিলি ছিল। সামনের এবং আশেপাশের পরিবেশটা খুবই রোমান্টিক এবং মনোলোভা .. এখনও সুযোগ পেলে ওই রুমে থাকতে বান্দা রিাজি আছে !!  

 

যাই হোক ,আইন বিভাগের ৩৫ তম ব্যাচে ভর্তি হওয়ার পরে এক কোচিং সেন্টার আল্লাহর রহমতে আমাকে নিয়ে টানাটানি শুরু করল। তাদের এ ব্রাঞ্চে একটু যেতে হবে ওই ব্রাঞ্চে একটু যেতে হবে, একটু মোটিভেশনাল ক্লাস নিতে হবে , একটু ইংরেজি / বাংলা / সাধারণ জ্ঞানের ক্লাস নিতে হবে এই সব আবদারে কোচিংটির পরিচালক আমাকে প্রতিনিয়ত জ্বালতন করতে লাগল । তার আবদার আর এক সিনিয়র ভাইয়ের পিড়াপিড়িতে আর নগদ নারায়ণের লোভে আমি ও প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবারের ১ টা ক্লাস মিছ দিয়ে দেশের এ মাথা ও মাথা কোচিং এ কোচিং এ ঘুরে বেড়াতে লাগলাম।  তারপর আমার এলাকার এক বড় ভাই আমার এটাস্ট হলে ভালো রুমে উঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সদ্যভূমিষ্ঠ কোচিং সেন্টারে প্রতিদিন যাতয়াত করাতে এক প্রকার বাধ্য করলেন। আমার ছবি নিয়ে আমাকে নিজের কোচিং সেন্টারের স্টুডেন্ট হিসেবে চালালেন। অবশ্য ভাই লাইন ঘাট করে ৬ জনের একটা ছোট রুমে উঠিয়ে দিয়েছিলেন।

 

কিন্তু সমস্যা যেটা হলো , সেটা হচ্ছে প্রতি সপ্তাহের শেষে ২ রাত জার্নি আর সারাদিন ক্লাসে দাড়িয়ে ক্লাস নিতে নিতে আমার অবস্থা টাইট হতে থাকলো্ । এমনিতে ছোটবেলা থেকে ছিলাম তাল পাতার সেপা্ই। তার উপর হলের খাবার আমার ননীর পুতুলের পেটে স্থায়ী আমাশয়ের জন্ম দিলো। আর অন্য দিকে ছাড়পোকার কামড়ে সারা শরীরে জুলুনি । এলার্জির সমস্যা থাকার কারণে ছাড়পোকা একটা কামড় দিলেই মোটামোটি ২-৩ ঘন্টা টের পেতাম। সো রুমে থাকা সম্ভব হতো না , রাতে ঘুমাতাম সূর্য়সেন হলের মসজিদে।

 

এভাবে বছর ঘুরে যাওয়ার পরে অনুভব করলাম , আমার আইন বিভাগের পড়াশুনা বেশি দূর এগোয় নি । টার্ম টিউটোরিয়ালে ৬০ % এর নিচে নাম্বার পেয়েছি। কিন্তু বছর শেষে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলাম - যখন দেখলাম আমার এটেন্ডেস আন্ডার ৬০ পারসেন্ট। আমি সপ্তাহে ১ টা ক্লাস মিস দিতাম বৃহস্পতিবারে , সেই হিসাবে আমার আশা ছিলো মিনিমাম ৭০ পারসেন্টের উপরে আমার এটেণ্ডেস থাকবে। যখন শুনলাম এটেন্ডেস ৫৮ পারসেন্ট তখন একটা চমৎকার ভুল সিদ্ধান্ত নিলাম । সিদ্ধান্ত নিলাম, একবছর ড্রপ দিয়ে আগামী বছর ভালো করে পড়ব। জরিমানা দিয়ে ফরম পূরণ না করে ফিরে গেলাম । কিন্তু সেই যে গেলাম .. ঢুকে গেলাম আধারের ঘোর কৃঞ্চগহ্বরে ..

পরে চিন্তা করলাম - আইন সাবজেক্টে পড়ব না। এখানে উকিলদের নিয়ে যেসব নেগেটিভ কথাগুলো প্রচলিত সেগুলো আমারে চিন্তা করতে বাধ্য করল এই সাবজেক্ট বাদ দিয়ে অন্যকোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়ার।

 

পরবর্তী বৎসরে এজন্য পূর্ণভর্তি হলাম না এবং ক্লাস ও করলাম না। আবারো ২০০৮ -০৯ সেশনের ফরম তুললাম এবং খ ইউনিটে হলাম ২০ জনের মধ্যে । তখন অনেক বড়ভাই আমার এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে আমাকে বকলেন , বুঝালেন এবং বললেন - আইনেই পড়ো ,, তুমি ঠিক তো জগৎ ঠিক । সো আবারো আইন বিভাগে ফিরে এলাম এবং পুন:ভর্তি হয়ে ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষাটা দিলাম । ......

তারপর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করলাম ..... ( পরবর্তী পোস্টে )